বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা:জমিদারি নেই। নেই আগের সেই প্রতিপত্তি। কিন্তু বনেদি বাড়ির আনাচে-কানাচে আজও যেন টিকে রয়েছে জমিদারি আমলের সেই জৌলুস। কোথাও প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, কোথাও আবার গোল হয়ে বসে পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করছেন বাড়ির মেয়ে-বউরা। সেই আবহেই ২৭৭ বছর ধরে প্রাচীন রীতিনীতি মেনে মা দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে বারুইপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১১৫৭ বঙ্গাব্দে পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রাজবাড়ি থেকে বারুইপুরে এসেছিলেন জমিদার সহস্ররাম বন্দ্যোপাধ্যায়। বারুইপুরে এসে তিনি সুবিশাল দালানবাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি একটি মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মন্দিরেই শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বারুইপুরের আদি গঙ্গা সংলগ্ন কল্যাণপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে হয়ে আসছে দুর্গাপুজো।
এই পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। রথের দিন কাঠামোয় প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রতিপদে বসে ঘট। এরপর কুলপুরোহিতের সঙ্গে তন্ত্রধারক শুরু করেন চণ্ডীপাঠ। দেবীর বোধন থেকে বিসর্জন—প্রতিটি আচারেই রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক পরম্পরার ছাপ। এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু কঠোর নিয়মও। মন্দিরে ঘট বসার দিন থেকেই পরিবারের সদস্যরা মাছ ছাড়া মাংস, ডিম ও পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ রাখেন। এই নিয়ম চলে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত। অর্থাৎ দেবীর আরাধনার সঙ্গে পারিবারিক জীবনযাপনেও চলে আসে বিশেষ নিয়মানুবর্তিতা।

পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার বলি। সপ্তমীর দিন মন্দির সংলগ্ন চাতালে যূপকাষ্ঠে পাঁঠাবলি হয়। অষ্টমীর সন্ধিপুজোর সময়ও রয়েছে পাঁঠাবলির রীতি। এমনকী নবমীর দিনও পাঁঠা ও শস্যবলি দেওয়া হয়। কয়েকশো বছরের পুরনো এই রীতিই এখনও পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ মায়ের ভোগ। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীকে নিবেদন করা হয় মাছ, মাংস, ডাল, খিচুড়ি-সহ নানা পদ। কিন্তু দশমীর ভোগে বদলে যায় মেনু। সেদিন অরন্ধন পালন করা হয়। আগে থেকে রান্না করে রাখা পান্তা ভাত ও কচু শাক নিবেদন করা হয় উমাকে। পরিবারের বিশ্বাস, সেই ভোগ গ্রহণ করেই মেয়ে উমা ফিরে যান কৈলাসে।
পরিবারের অন্যতম মহিলা সদস্য কল্পনা জানান, পুজোর কয়েকটা দিন তাঁদের দম ফেলার সময় থাকে না। ভোগ রান্না থেকে শুরু করে পুজোর বিভিন্ন কাজে পরিবারের মহিলারাই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তাঁর কথায়, পুজোর চারটে দিন আনন্দের মধ্যেই কেটে যায়। দশমীর দিন প্রাচীন নিয়ম মেনে পান্তা ভাত ও কচু শাক খাইয়ে উমাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর পর পরিবারের মহিলারা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। আধুনিকতার স্রোতে বহু পুরনো রীতি হারিয়ে গেলেও বারুইপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে আজও সেই পরম্পরার ছন্দ অটুট। জমিদারি নেই, সময় বদলেছে, কিন্তু ২৭৭ বছরের দুর্গাপুজোকে ঘিরে পরিবারের আবেগ, নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যে আজও পড়েনি ভাঁটা।