দিল্লি কি আবারও আন্দোলনের আঁচে উত্তপ্ত হতে চলেছে? রাজধানীর রাজপথে কি ফের মুখোমুখি হতে চলেছে বিরোধী শিবির আর প্রশাসন? নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে একের পর এক বিক্ষোভ, বিরোধী INDIA জোটের মিছিল, পুলিশের ব্যারিকেড, ধরপাকড় সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে উত্তাল হয়েছে দিল্লি। আর সেই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে আরও আন্দোলনের আশঙ্কা। একদিকে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি। অন্যদিকে ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-র আন্দোলন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এমনকী, বিক্ষোভের আশঙ্কায় অতিরিক্ত বাহিনীর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানোর জন্যও দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বারবার আন্দোলনের আশঙ্কায় নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলতে হচ্ছে রাজধানীকে? বিরোধীদের প্রতিবাদ কি এবার আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে? আর গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখবে কীভাবে প্রশাসন? দিল্লির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের সূত্রপাত গত সপ্তাহেই। নির্বাচন কমিশনের দফতর এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি। পাশাপাশি SIR বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে INDIA জোটের প্রতিবাদও চলছিল। দিল্লি পুলিশের আশঙ্কা ছিল, এই দুই আন্দোলনের পাশাপাশি ভীম আর্মি, ছাত্র সংগঠন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনও বিক্ষোভে যোগ দিতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। প্রথমে ৬ অক্টোবর ২২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে ৮ অক্টোবর আরও ৮০ কোম্পানি অনুমোদন পায়। অর্থাৎ মোট ৩০১ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়।

এরপর ১৩ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে ২৭৩ কোম্পানি বাহিনীর মোতায়েন ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায়। পুলিশ জানিয়েছিল, নতুন করে আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।অর্থাৎ, আন্দোলন থামেনি এমন দাবি করা যেমন ঠিক নয়, তেমনই আপাতত সব প্রতিবাদ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, সেটাও বলা যাচ্ছে না। বরং প্রশাসনের আশঙ্কা, নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি নতুন নয়। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে পথে নামে INDIA জোট। ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করার সময় রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়েছিল। মিছিল আটকে দেওয়ার পর ব্যারিকেডের সামনে অবস্থানেও বসেন নেতারা। এরপর ৮ অক্টোবরও দিল্লিতে বিরোধীদের প্রতিবাদ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এমনকী, কনট প্লেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও অতিরিক্ত পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।
কিন্তু বিরোধীদের আন্দোলন সেখানেই থেমে থাকেনি।I গত সোমবার ফের বড় মিছিলের ডাক দেয় INDIA জোট। এবার গন্তব্য ছিল সুপ্রিম কোর্ট। রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়্গে, অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা এই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল, SIR প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ সর্বোচ্চ আদালতের সামনে তুলে ধরা। পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে যায় মিছিল। পরে রাহুল গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। অর্থাৎ, রাজপথের আন্দোলনকে আদালতের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে বিরোধীরা।
কিন্তু দিল্লির আন্দোলনের সমীকরণে আরও একটি নাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিজেপি। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং SIR প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে এই সংগঠনও আন্দোলনের ডাক দেয়। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো হয়। কিছু মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ১০ অক্টোবর আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল বলে জানানো হয়। আন্দোলনের সংগঠকদেরও আটক করা হয়।
এই ধরপাকড় ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে প্রতিবাদ ঠেকাতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয়, আর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সাংবিধানিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে? একদিকে পুলিশের বক্তব্য, সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুতি প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রতিবাদের জায়গা সংকুচিত করা হচ্ছে। এই দুই অবস্থানের সংঘাতেই দিল্লির পরিস্থিতি ক্রমশ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
INDIA জোট টানা পাঁচ দিন দিল্লিতে মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালানোর পর আপাতত দৈনিক আন্দোলনের কর্মসূচিতে বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উৎসবের মরশুম এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব সমস্যা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রে খবর। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, SIR নিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক লড়াই শেষ হয়ে গিয়েছে। একই দিনে রাহুল গান্ধী CJP-র দুই নেতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রানকার বিচারবিভাগীয় হেফাজত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিবাদের সময় জাতীয় পতাকা ওড়ানো অপরাধ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের তরফে কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। ফলে INDIA জোটের দৈনিক কর্মসূচিতে বিরতি এলেও, অন্যান্য সংগঠনের সম্ভাব্য বিক্ষোভের আশঙ্কা থেকে প্রশাসন এখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। এই মুহূর্তে অবশ্য রাহুল গান্ধী ঠিক কবে আবার দিল্লির রাজপথে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাই যখন-তখন আন্দোলন কথাটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্ভাবনা বোঝালেও, একে নির্দিষ্ট কোনও নতুন কর্মসূচির ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।