প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার জানালেন, ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিকে ‘অমৃত মহোৎসব’ হিসেবে পালন করার পিছনে রয়েছে বিশেষ ভাবনা। তাঁর মতে, এই উৎসবের মাধ্যমে ভারতের প্রাচীন মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘চিন্ময় অমৃত মহোৎসব গ্লোবাল সম্মেলন’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের প্রাচীন জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণে সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে ‘অমৃত মহোৎসব’ পালনের ভাবনা ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তির সময় আমি ভেবেছিলাম, এই উপলক্ষ শুধু ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নয়, বরং ভারতের সেই মূল ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলারও সুযোগ, যা অমৃতের মতো মূল্যবোধকে ধারণ করে। বহু শতাব্দীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে ভারত যেন সব সময় মানবতার কল্যাণে কাজ করে। সেই কারণেই আমি এই উদ্যাপনের নাম দিয়েছিলাম ‘অমৃত মহোৎসব’।”
প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, দেশের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে এবং সমাজেও নানা ধরনের বিকৃতি দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যাগুলির মোকাবিলা করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তিনি বলেন, “গত কয়েক দশকে সময় অনেক বদলেছে। দেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে এবং সমাজেও নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যাগুলির সমাধানের দায়িত্ব আমাদের সকলের। যারা সমাজে বিভেদ তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার সংকল্পে প্রত্যেক নাগরিককে যুক্ত করতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণে আমাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। ২০৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীনতার ১০০ বছর উদ্যাপন করবে, তখন চিন্ময় মিশনও তাদের প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ করবে।”
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা সংকল্প গ্রহণ করেছে। এবার চিন্ময় মিশনও সেই জাতীয় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন নিজেদের যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ‘অমৃত সংকল্প’ গ্রহণ করেছে। এবার চিন্ময় মিশনও দেশের এই বৃহত্তর উদ্যোগ এবং ‘অমৃত কাল’-এর অংশ হিসেবে ‘অমৃত মহোৎসব’-এ যোগ দিয়েছে।”এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯৯৩ সালে স্বামী চিন্ময়ানন্দের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতিও ভাগ করে নেন। অনুষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে স্বামী চিন্ময়ানন্দের হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়। সেই প্রতিচ্ছবি দেখে এবং তার সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা পেয়ে তিনি যেন ৩৩ বছর আগের সময়ে ফিরে গিয়েছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
চিন্ময় মিশনের ৭৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানকে দেশের ‘অমৃত কাল’ এবং ‘অমৃত মহোৎসব’-এর সঙ্গে যুক্ত করার প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি, যুবসমাজকে শক্তিশালী করে তোলার বিষয়টিকে সরকার পরিচালনা এবং দেশ গঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ এখানে এসে আমার মনে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সেই অনুভূতিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। শ্রদ্ধেয় গুরুদেব স্বামী চিন্ময়ানন্দকে এই রূপে দেখা এবং তাঁর হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে মনে হচ্ছিল, যেন ৩৩ বছর আগের সময়ে ফিরে গিয়েছি। ১৯৯৩ সালে বরোদায় তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ, কথোপকথন, তাঁর স্নেহ ও আশীর্বাদ সব কিছু আজ আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।” তিনি আরও বলেন, “সেই কথোপকথনের মূল বিষয় ছিল যুবসমাজের শক্তিকে কীভাবে গড়ে তোলা যায় এবং সেই যুবশক্তির সাহায্যে কীভাবে একটি শক্তিশালী ও সক্ষম ভারত তৈরি করা যায়। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক বছর পর দেশের মানুষ আমাকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার আশীর্বাদ দিয়েছিলেন।”
চিন্ময় মিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংগঠন বেদান্ত দর্শনের একটি জীবন্ত রূপ। তাঁর মতে, চিন্ময় মিশন শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি চিন্ময় দর্শন এবং এক চিন্ময় সাধকের প্রতিষ্ঠিত ভাবনার প্রতিফলন। তিনি বলেন, “আজ চিন্ময় মিশনের ‘অমৃত মহোৎসব’-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এটি এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে সাধু-সন্তদের আমার প্রতি স্নেহ ও আশীর্বাদও প্রকাশ পেয়েছে। চিন্ময় মিশন শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি চিন্ময় দর্শনকে ধারণ করে। তাই ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘চিন্ময় অমৃত মহোৎসব’-এর নামের মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে।”
এদিন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথাও উল্লেখ করেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী—সরকারের প্রধান হিসেবে টানা প্রায় ২৫ বছর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি চিন্ময় মিশনের যুব শাখার কাজের প্রশংসা করেন। মোদি বলেন, “গত ২৫ বছর ধরে সরকারের প্রধান হিসেবে আমি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের সেবা করে চলেছি। এই পুরো সময়ে দেশের যুবসমাজ আমার কাজ ও নীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল। চিন্ময় অমৃত মহোৎসবেও যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে, তা দেখে আমি আনন্দিত।”
তিনি আরও জানান, চিন্ময় মিশনের বহু তরুণ সদস্য প্রায় ৩০০ দিনে ৪০ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। এই সময়ে তাঁরা এক লক্ষেরও বেশি তরুণ-তরুণীর কাছে পৌঁছেছেন। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন ভারতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তোলা জরুরি। জাতীয় শিক্ষানীতিতে ভারতের প্রাচীন জ্ঞান ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি মাতৃভাষায় শিক্ষা, আধুনিক বিজ্ঞান এবং নতুন প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন ভারতের প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই করে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করেছি। এই নীতিতে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, আধুনিক বিজ্ঞান এবং নতুন প্রযুক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।” পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, এই স্মৃতিসৌধ আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।