একটা দেশ, দুটো রাজনৈতিক শিবির। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে দেশের ক্ষমতা একসময় ছিল তাঁরই হাতে, সেই দেশেই ফিরতে চান তিনি। জানেন, ফিরলেই গ্রেফতার হতে পারেন। জেলে যেতে পারেন। এমনকী প্রাণও যেতে পারে। তবুও পিছিয়ে আসতে নারাজ হাসিনা।

চরম পরিণতিই যদি তাঁর নিয়তি হয়, তাহলে নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষদের মাঝেই প্রাণত্যাগ করতে চান তিনি। বুধবার সংবাদ সংস্থা এপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কার্যত এই বার্তাই দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এতটা মরিয়া হয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাইছেন হাসিনা? কেন তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক গ্রেফতারি? তারেক রহমানের সরকার কি সত্যিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, নাকি হাসিনার অভিযোগ অনুযায়ী, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে শেখ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে? এই পরিস্থিতিতে ভারত থেকেই কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে ঝড় তুলতে চলেছেন শেখ হাসিনা?
বুধবার এপি-কে ইমেল সাক্ষাৎকারে হাসিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, তা বদলায়নি। তাঁর কথায়, ‘যদি মৃত্যুই আমার নিয়তি হয় তবে আমি আমার নিজের দেশের মাটিতে আমার নিজের মানুষদের মাঝেই মৃত্যুবরণ করতে চাই। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরব আমার সিদ্ধান্ত বদলায়নি’
কিন্তু এই ফেরার পথ যে মোটেই মসৃণ নয়, তা নিজেও জানেন হাসিনা। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে। জেলে যেতে হতে পারে। এমনকী নির্যাতন কিংবা জীবন শেষের আশঙ্কাও রয়েছে। তারপরেও কেন ফিরতে চান? হাসিনার বক্তব্য, দূরে বসে নিজের দেশের মানুষকে কষ্ট পেতে দেখেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন না তিনি।
শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারত কিংবা আমেরিকার মতো দেশ কি বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করে তাঁর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা করেন? জবাবে হাসিনা জানিয়েছেন, নিজের দেশে ফিরতে কোনও বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ তাঁর প্রয়োজন নেই। তাঁর বক্তব্য, সমস্ত দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ। কিন্তু নিজেরে দেশে ফেরার জন্য কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের অনুমোদন বা আশীর্বাদ প্রয়োজন নেই তাঁর।
বাংলাদেশে বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শাসন ক্ষমতায় ফিরেছেন। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল হলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং দলের একাধিক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মালা হয়েছে। এখানে প্রশ্ন তুলেছেন হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, অন্তত ২০ হাজার আওয়ামী লীগ সদস্যকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে। হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেফতার, নির্যাচন কিংবা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু সমর্থক তাঁদের বাড়ি, ব্যবসা এবং জীবিকা হারিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এত অদ্ভূত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চরম সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। অন্যদিকে ক্ষমতায় বিনপি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মাঝখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, গ্রেফতার হওয়া নেতা-কর্মী এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের বিচার ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ডিসেম্বর মাসে সত্যিই কি ভারতে নিজের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে বাংলাদেশে পা রাখবেন হাসিনা? যদি ফেরেন তাহলে কি সরাসরি গ্রেফতার হবেন? নাকি তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে নতুন করে উত্তাল হবে বাংলাদেশের রাজপথ?