সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্য়ায়, সাংবাদিক : সম্পর্কের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস যেন ক্রমশ উঠে যাচ্ছে। আর সেটাই হয়ত স্বাভাবিক। কারণ এমন কিছু ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে যেখানে মানুষ ভালোবাসতেই ভয় পাচ্ছে। দেখুন যে কোন সম্পর্কেই বিচ্ছেদ আসতে পারে কিন্তু সেই বিচ্ছেদ কেন একটা মানুষের প্রাণ নিয়ে নেবে? যাকে একদিন ভালোবাসি বলেছিল কেউ সেই মানুষটাকেই কিভাবে খুন করা যায়? এই সব ঘটনা বারবার প্রকাশ্যে আনে সামাজিক অবক্ষয়কেই। দিল্লিতে ইউপিএসসি পরীক্ষার্থী রামকেশ মীনার হত্যাকাণ্ড এই মুহূর্তে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল তরুণ প্রজন্ম কেন এত অসহিষ্ণু? এই ঘটনার কথা শুনলে কার্যত শিউরে উঠতে হয় যার পরতে পরতে রহস্য রয়েছে লুকিয়ে রয়েছে প্রতিহিংসাপরায়ণতা। গত ৬ অক্টোবর, উত্তর দিল্লির তিমরপুরে একটি বাড়িতে আগুন লাগার খবর মেলে। পুলিশ গিয়ে চারতলা ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে এক বছর বত্রিশের যুবকের দেহ উদ্ধার করে। যুবকের নাম রামকেশ মিনা। যদিও প্রথম থেকেই রামকেশের পরিবার অগ্নিকাণ্ডের তত্ত্ব মানতে নারাজ ছিল। পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতেই দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডের আগের দিন একজন মহিলা ও একজন পুরুষ সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে বিল্ডিংয়ে ঢুকছে। এর কিছুক্ষণ পর একজন বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ও মহিলাকে বের হতে দেখা যায়। এই ফুটেজ থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হয়ে যায় এটা নিছকই আগুন লাগার কোন ঘটনা নয় এটা খুন আর তারভ তদন্তে নেমে যা যা তথ্য সামনে আসে তা বিস্ফোরকই বটে। যে ঘর এই মুহূর্তে কার্যত পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে সেই ঘরেই রামকেশ স্বপন দেখেছিলেন, প্রেমিকা অমৃতাকে নিয়ে এক সোনালী জীবনের স্বপন, তিনি বুঝতে পারেননি সেই প্রেমিকার হাতেই জীবনের ইতি ঘটবে। সিসিটিভি ফুটেজ রামকেশের কললিস্ট সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট খতিয়ে দেখে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।
সেই সূত্র ধরেই আটক হন রামকেশের প্রাক্তন প্রেমিকা অমৃতা। হ্যা ব্রেক আপ হয়ে গিয়েছিল তাদের। গত মে মাস থেকে রামকেশের সঙ্গে লিভ ইন করতেন অমৃতা। ফরেন্সিক সায়েন্সে স্নাতকের ছাত্রী তিনি। পরিবারের সঙ্গে তার কোন সম্পরকছিলনা, বাবা মেয়েকে ত্যায্য কন্যা ঘোষণা করেন শুধু মৌখিক ভাবে নয় রীতিমত খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে। ২০২৪ সালের ৮ জুলাই সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে অমৃতার সঙ্গে পরিবারের সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদের কথা ঘোষণা করা হয়। যে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, অমৃতার সঙ্গে চৌহান পরিবারের সব সম্পর্ক ছিন্ন করা হল। এখন থেকে ও যা কাজ করবে, তার সমস্ত দায় ওর নিজেরই। পরিবার এর জন্য কোনও দায় নেবে না। অশ্লীল আচরণ এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে অমৃতাকে ত্যাজ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর বাবা। শুরুতে রামকেশের সঙ্গে সম্পর্ক তারপরে লিভ ইন করার সিদ্ধান্ত সব ভালোই চললেও এই সম্পর্ক ত্রিকোণ প্রেমের আকার নিয়ে নেয় যখন এর মধ্যেই প্রাক্তন প্রেমিক সুমিত ফিরে আসে অমৃতার জীবনে। আবার পুলিশের জেরায় অমৃতা জানিয়েছেন তিনি জানতে পারেন রামকেশ লুকিয়ে তাঁর ভিডিয়ো এবং ছবি তুলেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’জনের সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। রামকেশকে সেই সব ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিয়ো মুছে ফেলতে বলেন অমৃতা। বার বার অনুরোধ করেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন তিনি। কিন্তু রামকেশ নাকি সেগুলি মুছে ফেলতে অস্বীকার করেন। এরপর অমৃতার মনে হয় তিনি এর উপযুক্ত জবাব দেবেন রামকেশকে,কিন্ত অমৃতা এই জবাব দেওয়ার মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে গেল না?যে জবাব দিতে গিয়ে একটা জীবন মুছে গেল দুনিয়া থেকে। অমৃতা যোগাযোগ করেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক সুমিত কাশ্যপ এবং আরও এক যুবক সন্দীপ কুমারের সঙ্গে। এই তিন জনই উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, ৫ অক্টোবর মোরাদাবাদ থেকে দিল্লি আসেন তিন জন। অমৃতার ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে পুলিশ জানতে পেরেছে, খুনের পাঁচ দিন আগে বেশ কয়েকটি রিল বানিয়ে পোস্ট করেছিলেন তিনি। ইনস্টাগ্রামে বেশ সক্রিয় অমৃতা। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১১টি রিল শেয়ার করেছেন তিনি।নিজে যেহেতু এক জন ফরেন্সিক বিষয়ের ছাত্রী, তাই খুনের পর কী ভাবে প্রমাণ লোপাট করা যায়, গোটা পরিকল্পনাটাই করেছিলেন অমৃতা। খুনের প্রমাণ মুছে দিতে একমাত্র উপায় অপরাধস্থলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। আর সেটাই করেছিলেন তিনি। আর যেহেতু তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক গ্যাস এজেন্সিতে কাজ করতেন, তাঁর অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগান অমৃতা। খুনকে দুর্ঘটনা হিসাবে দেখাতে চমকে ওঠার মতো ছক কষেন তিনজন মিলে। প্রথমে রামকেশকে গলা টিপে খুন করা হয়, তারপর মৃতদেহে ঘি-মদ মাখিয়ে মাথার কাছে সিলিন্ডার রেখে আগুন ধরায়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে গান্ধী বিহারের ফ্ল্যাটে আগুন ধরে যায়, দমকল এসে ৩২ বছরের রামকেশ মিনা-র দগ্ধ দেহ উদ্ধার করে। সব শেষে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের ভাল্ভ খুলে দিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা। খোলা গ্যাস সিলিন্ডার থেকেই বিস্ফোরণটি ঘটে। তবে শেষ রক্ষা তো হলনা কারণ সিসিটিভিই ধরিয়েব দিল অপরাধীদের। অন্যদিকে নিহত যুবকের ফ্ল্যাট থেকে যে হার্ডডিস্ক উদ্ধার হয়েছে, সেখানে শুধু অমৃতার গোপন ভিডিয়ো বা ছবি নয়, ১৫ জনের বেশি মহিলার গোপন ভিডিয়ো এবং ছবি পাওয়া গিয়েছে। শুধু তাঁর লিভ ইন সঙ্গী অমৃতা চৌহানের গোপন ভিডিয়ো বা ছবি নয়, আসুন শোনাই দিল্লির ডিসিপি নর্থ রাজা বানঠিয়া এই তদন্ত প্রসঙ্গে ঠিক কি বলেছেন?

সত্যিই এই ঘটনা শিউরে ওঠার মতই। ঐ যে শুরুতে বললাম ,সম্পর্ক বিষয়টা বড্ড ঠুনকো হয়ে গিয়েছে। বাড়ছে ডিভোর্স ব্রেক আপ কারণ একসঙ্গে থাকার স্পৃহার বদলে বাড়ছে প্রতিশোধ স্পৃহা তাই কোন ক্ষেত্রে প্রেমিকা শ্রদ্ধাকে খুন করে তার দেহ টুকরো করে কুকুরকে খাইয়ে দেয় প্রেমিকা আবার অমৃতারা সুযোগ খোঁজেন প্রেমিককে খুন করার, সম্পর্ক আজ নিছকই টাইমপাস।