আগের তিনবার যাই হোক না কেন, এবার উল্টোটাও হতেই তো পারে। সুশাসনের আশ্বাস, কর্মসংস্থানের আশ্বাস, সোনার বাংলার স্বপ্ন তো চাকা ঘোরাতেই পারে।

স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। অব কি বার মোদী সরকার। দিল্লিতে গেরুয়া ছুঁড়েছে, লালকেল্লায় পতাকা উড়েছে। কিন্তু সোনার বাংলায় বিজয়পতাকা ওড়ানোর স্বপ্ন বারবার আদিগঙ্গার জলে ভেসেই গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং-সহ বিজেপির তাবড় নেতারা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করলেও চিঁড়ে ভেজেনি। বাংলার মানুষ যে কি চায় আর কী খায়, তার হদিশ করতে গিয়ে বারবার কানাগলিতে পথ হারিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। অথচ পাশের বাঙালি প্রধান ত্রিপুরা দেখুন, ব্রহ্মপুত্র-বরাকের অসম দেখুন, জয় জগন্নাথের ওড়িশা বলুন, সবাই গেরুয়ায় ভিজেছে, সেজেছে, মেতেছে। চারপাশে জয় শ্রীরাম, প্রভুর শরনে মেরে নাম। শোনা গিয়েছে পবনপুত্র হনুমানের জয়গাথা। কিন্তু বাংলার লোকগুলোর পেটে পেটে যে কী চলে তার হদিশ মেলাই ভার। রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী নাম বারবার জপ করলেও কিছুই ধোপে টেকেনি। ভোটবাক্সে সবই ধপ ধপ ধপাস। ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষার উপর আঘাত, বাঙালিদের উপর নির্যাতন, এসআইআর, এনআরসির অশনি সঙ্কেত বঙ্গ বিজেপি নেতাদের মুখ ভার করেছে। বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তাঁরা দেওয়াল লিখন পড়েছেন। যদিও প্রকাশ্যে তাঁরা বলছেন, সবটাই অপপ্রচার। আবার কেউ কেউ বলেও ফেলছেন, ছাব্বিশের ভোটে না জিতলেও বঙ্গে গেরুয়ার অস্বিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। হেমন্তের পড়ন্ত বিকালে সেই বিজেপিকেই যেন একবুক স্বপ্ন দিয়ে গেল বিহারের ফল। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের অধীশ্বর হওয়ার স্বপ্নকে যেন ফের জাগিয়ে তুলল। বিহারেরই নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং তো বলেই ফেললেন, অধরা স্বপ্ন পূরণ হতে আর দেরি নেই। ছাব্বিশের ভোটেই হয়ে যাবে হেস্তনেস্ত। বিজেপিই আসছে। তৃণমূল তোমার দিন শেষ।

শোন শোন গেরোবাজ, খোপ থেকে বেরো আজ। গানটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে। গিরিরাজ আর গেরোবাজ এক নয়। ১০০ দিনের কাজ আর কেন্দ্রীয় প্রাপ্য নিয়ে তৃণমূল সরকারের সঙ্গে তাঁর বহুদিনের আদায়-কাঁচকলায়। তৃণমূলের নেতামন্ত্রীরা দরজার এদিক দিয়ে ঢুকলে তিনি অন্য দিক দিয়ে নাকি কোথায় চলে যান। সে অন্য কথা। পুরানো কথা। কথা হল, বিহারের ভোট যেমন আরজেডির লণ্ঠন নিভিয়েছে, উল্টো দিকে বঙ্গ বিজেপির নিভু নিভু স্বপ্নকে ফের জাগ্রত করেছে। রোহিঙ্গা, না খায়ুঙ্গা না খানে দুঙ্গার ঘোর বিরোধী বঙ্গ বিজেপি নেতারাও তাই রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয় হবে। এবার হবেই। সিওর শট। বাজি এবার মারবই।
লক্ষ্য স্পষ্ট। এক ও অদ্বিতীয় বাংলা। সুনার বাংলা। আর গন্ধ শুকে বেড়ানো নয়। বাংলার হৃদয় জিততেই হবে। শোনা যাচ্ছে, ভোট বাংলায় প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গ সফর খুব দ্রুতই ছকে ফেলা হবে। একইভাবে তাবড় কেন্দ্রীয় নেতাদের। আর দেরি নয়, এবার বঙ্গ বিজয়। ২০১১, ২০১৬, ২০২১। রাজ্যে জয়ের হ্যাটট্রিক হয়ে গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০১৪, ২০১৯ আর ২০২৪। দিল্লিতে জয়ের হ্যাটট্রিক সেরে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদীও। কিন্তু ডবল ইঞ্জিন কোথাও যেন বুকে ধাক্কা মারে। এত সব হয়, বাংলাটা হয় না কেন। এত ফুল ফোটে, পদ্মফুল ফোটে না কেন। বাংলা কি তবে পরিবর্তন চায় না। তাই বা কী করে হয়। পরিবর্তন তো জগতেরই নিয়ম। তাই আগের তিনবার যাই হোক না কেন, এবার উল্টোটাও হতেই তো পারে। সুশাসনের আশ্বাস, কর্মসংস্থানের আশ্বাস, সোনার বাংলার স্বপ্ন তো চাকা ঘোরাতেই পারে। তাই বিহার ভোট আসলে বাংলা ভোটেরই ডঙ্কা বাজাল। বিজেপিকে স্বপ্ন দেখাল আর রাজ্যের শাসক দলকেও চার্জড আপ করল। লড়াই যখন হবেই তখন ভোটের ময়দানেই দেখা হোক।