সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : একজন স্বঘোষিত ধর্মগুরু। আধ্যাত্মিকতার আড়ালে তৈরি হয়েছিল প্রভাবশালী সাম্রাজ্য। রাজনীতির সঙ্গে যোগ, ভক্তদের অগাধ বিশ্বাস। আর সেই মানুষকেই ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ। ধর্ষণ, কালো জাদু, এমনকি নরবলি! মহারাষ্ট্রের নাসিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন তীব্র চাঞ্চল্য। কে এই ধর্মগুরু অশোক খারাত? কীভাবে এতদিন ধরেই চলছিল এই অভিযোগের ছায়া? আর তদন্তে একের পর এক উঠে আসছে কোন তথ্য?

অভিযুক্ত অশোক খারাত- যিনি নিজেকে ধর্মগুরু ও জ্যোতিষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নাসিক জেলার সিন্নার এলাকায় একটি মন্দির ট্রাস্ট পরিচালনা করতেন তিনি। বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে কিন্তু এই প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর অভিযোগের পাহাড়।
একজন ৩৫ বছর বয়সী মহিলা অভিযোগ করেন, গত তিন বছর ধরে তাঁকে বারবার ধর্ষণ করেছেন অশোক খারাত। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ১৮ মার্চ গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। এরপর যেন একে একে খুলতে শুরু করে অভিযোগের দরজা।
গ্রেফতারের পর আরও একাধিক মহিলা সামনে এসে একই ধরনের অভিযোগ জানান। ফলে মামলার গুরুত্ব ও পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে মহারাষ্ট্র সরকার একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি গঠন করে। এই এসআইটির নেতৃত্বে রয়েছেন আইপিএস কর্মকর্তা তেজস্বিনী সাতপুতে। তদন্ত শুরু হতেই সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গত পাঁচ দিনে এসআইটির কাছে ৫০টিরও বেশি ফোনকল এসেছে, যেখানে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ বা তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ফোনকল আসছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। এই অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাসও দিয়েছে এসআইটি।
তদন্তের সূত্র ধরে রবিবার এসআইটি পৌঁছয় নাসিকের ঈশানেশ্বর মহাদেব মন্দির-এ। এই মন্দিরের সঙ্গে অভিযুক্তের যোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে মন্দিরের পুরোহিত প্রমোদ গাদখ এবং এক প্রহরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগে, শিরডি থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্রে খারাটের অফিসের কর্মী নীরজ যাদবকে টানা সাত ঘণ্টা জেরা করা হয়।
এসআইটি ইতিমধ্যেই খারাতের একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে- মিরগাঁওয়ের ফার্মহাউস, টিকড়ে কলোনির বাংলো এবং কানাডা কর্নারের অফিস। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নথি, ডায়েরি, কাগজপত্র এবং সিসিটিভি ডিভিআর। ফরেনসিক টিম এই প্রমাণগুলির বিশ্লেষণ করছে। তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ। এক ২৪ বছর বয়সী নারী দাবি করেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং তথ্য প্রযুক্তি আইনের অধীনে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ- কালো জাদু এবং নরবলির মতো অমানবিক কার্যকলাপ। এই অভিযোগের ভিত্তিতে মহারাষ্ট্রের বিশেষ আইন- অমানবিক ও কুসংস্কার বিরোধী আইনের অধীনে মামলা করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও তদন্তাধীন, তবুও বিষয়টি নিয়ে জনমনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাসিক জেলা প্রশাসন অভিযুক্তের অস্ত্র লাইসেন্সও স্থগিত করেছে। ২০১২ সালে নেওয়া রিভলভার লাইসেন্সটি ২০২৮ পর্যন্ত বৈধ ছিল। কিন্তু একাধিক গুরুতর অভিযোগের পর প্রশাসনের আশঙ্কা- এই অস্ত্র ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো হতে পারে। তাই Arms Act-এর ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তার কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তের গ্রাম মিরগাঁওয়েও তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, গ্রামের সুনাম নষ্ট হয়েছে। কেউ কেউ অভিযুক্তের কঠোরতম শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের দাবিও তুলেছেন। এছাড়া তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং মন্দির ট্রাস্ট স্থানীয়দের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিও উঠেছে।
মহারাষ্ট্রের নাসিকের এই বহুল আলোচিত মামলায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে যখন অভিযুক্ত অশোক খারাত-এর সঙ্গে রাজ্যের মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন রূপালী চাকাঙ্কার-এর সম্পর্কের প্রসঙ্গ সামনে আসে। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যাওয়ায় রাজনৈতিক চাপ বাড়তে শুরু করেছে এবং বিরোধীরা রূপালির পদত্যাগের দাবিও তুলেছে। এদিকে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী যোগেশ কদম জানিয়েছেন, রূপালি ওই ট্রাস্টের সদস্য কিনা এবং তাঁর কোনও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ৬৭ বছর বয়সী খারাট নিজেকে প্রাক্তন নৌসেনা অফিসার বা ‘ক্যাপ্টেন’ পরিচয়ে মহিলাদের আস্থা অর্জন করতেন এবং ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের নামে তাঁদের ডেকে এনে মাদক প্রয়োগ করে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের দাবি, গোটা ঘটনাই সিসিটিভিতে রেকর্ড করা হত এবং তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া একটি পেন ড্রাইভে ৫০-এর বেশি মহিলার সঙ্গে অভিযুক্তের আপত্তিকর ভিডিও মিলেছে। ইতিমধ্যেই তদন্তকারীরা তাঁর নাসিকের ফার্মহাউসে ফাঁদ পেতে অভিযুক্তকে ধরার চেষ্টা করেন—রাতের অন্ধকারে ‘চোর চোর’ চিৎকার আসলে ছিল পুলিশের পরিকল্পিত অভিযান, যার মাধ্যমে অভিযুক্তকে চাপে ফেলে আরও তথ্য আদায়ের চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনার পর এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে- কীভাবে এতদিন ধরে এই ধরনের অভিযোগ চাপা ছিল? কীভাবে একজন ব্যক্তি ধর্মগুরু পরিচয়ে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন? তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ কতটা গভীর?
সব মিলিয়ে, অশোক খারাটকে ঘিরে এই মামলা এখন শুধুমাত্র একটি অপরাধ তদন্ত নয়- এটি সমাজ, বিশ্বাস এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। এখন দেখার, এই মামলার শেষ পর্যন্ত কী কী সত্য সামনে আসে এবং আইনের চোখে কী বিচার হয়।