সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : টাকার পতন নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক সেই সময় সংসদে আশ্বাস দিলেন অর্থমন্ত্রী- ভারতের অর্থনীতি মজবুত, টাকার অবস্থানও স্থিতিশীল। কিন্তু বাস্তব ছবিটা কি সত্যিই তেমন? কারণ সেই একই দিনে বাজারে ঘটে গেল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা- ডলারের দাপটে ৯৫-এর গণ্ডি পার করল ভারতীয় মুদ্রা। তাহলে প্রশ্ন উঠছেই- আশ্বাস আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক কোথায়?

সোমবার দিনের মধ্যে একসময় মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার দাম পৌঁছে যায় ৯৫.২২-এ- যা ঐতিহাসিক রেকর্ড। পরে কিছুটা নেমে ৯৪.৭০-এ থামলেও, পতনের ধারা কিন্তু স্পষ্ট। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৯.৮৮ শতাংশ- যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। এই পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেন, ভারতের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, আর্থিক শৃঙ্খলাও বজায় রয়েছে এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রা ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাঁর কথায়- “রুপি ঠিক চলছে।”
এই মন্তব্যের পরই রাজনৈতিক চাপ বাড়তে শুরু করে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি কেন্দ্রকে আক্রমণ করে দাবি করেন, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘সারেন্ডার’ করা হয়েছে। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে বিরোধীরা বলছে- স্বাধীনতার ৭৮ বছরে এই প্রথম ডলার ৯৫ ছাড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
কংগ্রেসেরই নেতা দীপেন্দর সিং হুদা দাবি করেছেন, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রার অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানিয়েছেন, মুদ্রার দাম নির্ধারিত হয় বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। সরকার ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। শুধু মুদ্রা নয়, শেয়ার বাজারেও বড়সড় ধস নেমেছে। BSE Sensex পড়ে যায় ১৬৩৫ পয়েন্টেরও বেশি, নেমে আসে ৭১ হাজারের ঘরে। Nifty 50-ও ধাক্কা খেয়ে থামে ২২,৩৩১-এ। মাত্র দু’দিনে বাজার থেকে মুছে গেছে প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ- যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর ফলে ডলারের চাহিদা বেড়েছে, আর টাকার উপর চাপ আরও বেড়েছে। শুধু গত চার সপ্তাহেই ডলারের দাম প্রায় ৩.৫ টাকা বেড়েছে- যা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই পরিস্থিতির পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ। ইরান-ইজরায়েল সংঘাত এখন পঞ্চম সপ্তাহে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউনাইটেড স্টেটস-এর সামরিক উপস্থিতি এবং হুথি গোষ্ঠীর সক্রিয়তা। ফলে গোটা অঞ্চলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে। ভারত যেহেতু আমদানি নির্ভর দেশ, তাই তেলের দাম বাড়লে সরাসরি আমদানি খরচ বাড়ে। ফলে বেশি ডলার খরচ করতে হয়- আর সেই কারণেই টাকার অবমূল্যায়ন হয়।

পটনা আইআইটির অর্থনীতিবিদ রাজেন্দ্র প্রামানিক মনে করছেন, ডলার ৯৫ পার করা অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তাঁর মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই বাজারে আতঙ্ক বাড়ছে। অন্যদিকে আইসিএআই-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান অনির্বাণ দত্ত বলেছেন, বিদেশি লগ্নি প্রত্যাহার এবং তেলের দাম বৃদ্ধিই টাকার উপর প্রধান চাপ তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আরও সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ‘ভোলাটিলিটি ইনডেক্স’ ২৮-এ পৌঁছেছে- যা অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত। অর্থাৎ বাজার এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, একদিকে সরকারের আশ্বাস- অন্যদিকে বাজারের বাস্তব ছবি। টাকার রেকর্ড পতন, শেয়ার বাজারে ধস, তেলের দাম বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- যুদ্ধ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কীভাবে হস্তক্ষেপ করবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে? কারণ, অর্থনীতির এই টানাপোড়েনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপরেই।