সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভারতের খুচরো ব্যবসার জগতে এবার বড়সড় টানাপোড়েন। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত ডেলিভারির যুগ, অন্যদিকে বহু দশকের পুরনো মুদির দোকানের অস্তিত্ব সংকট। এই সংঘাত এবার পৌঁছে গিয়েছে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র দরজায়। অভিযোগ উঠছে- দ্রুতগতির “কুইক কমার্স” প্ল্যাটফর্মগুলির আগ্রাসী বিস্তারই ধীরে ধীরে ছোট ছোট পাড়ার দোকানগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আর সেই কারণেই শুরু হয়েছে বড় বিতর্ক- বিশেষ করে Zepto-র আসন্ন IPO-কে কেন্দ্র করে।

প্রথমেই বোঝা যাক, সমস্যা কোথায়। ভারতের প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি গলিতে ছড়িয়ে থাকা মুদির দোকান- যেগুলো বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এখন সেই দোকানগুলিই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ, দ্রুত ডেলিভারি দিচ্ছে নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো- Zepto, Blinkit, Swiggy Instamart। এই সংস্থাগুলি শুধু দ্রুত ডেলিভারি দিচ্ছে না, বরং বড় ডিসকাউন্টও দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। All India Consumer Products Distributors Federation-এর দাবি- ২০২৬ অর্থবর্ষে প্রায় ১০ লক্ষ মুদির দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে- দাম কমানোর চাপ, লাভের মার্জিন কমে যাওয়া, ক্রেতাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঝোঁক। এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে এই সংগঠন। তাদের দাবি- এই প্ল্যাটফর্মগুলির বিরুদ্ধে তদন্ত করা হোক, Competition Commission of India যেন “predatory pricing” খতিয়ে দেখে এবং সবচেয়ে বড় দাবি- Zepto-র IPO আপাতত বন্ধ রাখা হোক।
এবার আসি Zepto-র IPO প্রসঙ্গে। Zepto ২০২৬ সালে একটি বড় IPO আনতে চলেছে। প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা, কোম্পানির সম্ভাব্য মূল্যায়ন ৭-৮ বিলিয়ন ডলার। তবে এখানেই প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি। তাদের দাবি- এই মূল্যায়ন “বাস্তবসম্মত” নয় বরং অতিরিক্ত ডিসকাউন্ট ও লোকসানের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি পৌঁছে গেছে Securities and Exchange Board of India-র কাছেও। সংগঠনগুলির বক্তব্য- এই ধরনের ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়, এতে পুরো রিটেল ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- “Predatory Pricing” কী?
সহজভাবে বললে- বাজার দখল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করা। যাতে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে না পারে। অভিযোগ উঠছে, কুইক কমার্স সংস্থাগুলি ঠিক এই কৌশলই ব্যবহার করছে। এদিকে আরও একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। মহারাষ্ট্রে কিছু “ডার্ক স্টোর”-এ অভিযান চালিয়ে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। পণ্যে ছত্রাক, অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষণ, লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল। এই ঘটনাগুলি কুইক কমার্স সংস্থাগুলির ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
আরেকটি বড় অভিযোগ এসেছে Confederation of All India Traders-এর তরফে। তাদের দাবি- এই সংস্থাগুলি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙছে এবং প্রতিযোগিতার নিয়ম লঙ্ঘন করছে।
এখন প্রশ্ন- এই পুরো লড়াইটা আসলে কিসের?
এটা শুধু ব্যবসার লড়াই নয়-
“পুরনো বনাম নতুন”
“স্থানীয় দোকান বনাম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম”
“মানবিক সম্পর্ক বনাম প্রযুক্তি নির্ভর সুবিধা”
একদিকে- কিরানা দোকান, পরিচিত দোকানদার, বাকিতে জিনিস দেওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্ক। অন্যদিকে- অ্যাপ, ডিসকাউন্ট, ১০-২০ মিনিটে ডেলিভারি, ক্যাশব্যাক। এই দুই মডেলের সংঘর্ষই এখন ভারতের খুচরো বাজারকে নতুন করে গড়ে দিচ্ছে।
তবে সাধারণ মানুষের দিক থেকেও বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই বলছেন- কম দামে জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, সময় বাঁচছে, সুবিধা বাড়ছে। আবার অন্যদিকে-স্থানীয় দোকান বন্ধ হয়ে গেলে, কর্মসংস্থান কমবে, ছোট ব্যবসা হারিয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে- এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে এগিয়ে দেওয়া, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সবশেষে বলা যায়- Zepto-র IPO শুধু একটি কোম্পানির বাজারে আসা নয়, এটি ভারতের খুচরো ব্যবসার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি বড় মুহূর্ত। এখন দেখার- সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তদন্ত হয় কি না আর সবচেয়ে বড় কথা- কিরানা দোকানগুলো কি টিকে থাকতে পারবে এই ডিজিটাল যুগে?