রিয়া দাস, সাংবাদিক : ৬ মে মধ্যমগ্রামের সেই রক্তাক্ত রাত এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয়। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে ঘিরে পরিকল্পিত হামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। আর সেই কারণেই এই খুন শুধুমাত্র একটি হত্যার ঘটনা নয় বরং হয়ে উঠেছে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব। চন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডে ইতিমধ্যেই তিন জনকে গ্রেফতার করেছে তদন্তকারী দল। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ধরা হয়েছে অভিযুক্তদের। ধৃতদের নাম ময়াঙ্করাজ মিশ্র, ভিকি মৌর্য ও রাজ সিং। এর মধ্যে ময়াঙ্করাজ এবং ভিকিকে বিহারের বক্সার থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে পাকড়াও করা হয়েছে রাজ সিংকে। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের মধ্যে পেশাদার শুটারও রয়েছে। তাঁদের ইতিমধ্যেই কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে ও আদালতেও পেশ করা হয়।

তদন্তকারীদের মতে, এই গ্রেফতারির মধ্যেই শেষ নয় রহস্য। বরং এখনও অধরা রয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাথা। তদন্তকারী সংস্থার অনুমান, আরও বেশ কয়েকজন এই খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাঁদের কেউ কেউ এখনও ভিনরাজ্যে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। সেই কারণেই উত্তরপ্রদেশ, বিহারের পাশাপাশি অন্য রাজ্যেও নজর রাখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং দীর্ঘ পরিকল্পনা করেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। প্রাথমিক অনুমান, অন্তত এক থেকে দেড় মাস আগে থেকেই খুনের ছক কষা শুরু হয়েছিল। এখন ধৃতদের জেরা করে সেই পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে। তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছেন আধিকারিকেরা। জানা গিয়েছে, খুনে ব্যবহূত চারচাকার গাড়িটি ঝাড়খণ্ড থেকে আনা হয়েছিল। সেই গাড়ি থেকেই বালি টোলপ্লাজার অনলাইনে টাকা পাঠানো হয়েথিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। সেই ডিজিটাল সূত্র ধরেই শুরু হয় অভিযুক্তদের খোঁজ। পরে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে অভিযান চালিয়ে ধরা হয় তিন সন্দেহভাজনকে। গ্রেফতারের পর ইতিমধ্যেই ধৃতদের জেরাও শুরু করেছে আধিকারিকেরা। বিহারের বক্সার থেকে গ্রেফতার করা হয় ময়াঙ্করাজ মিশ্র ও ভিকি মৌর্যকে। উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয় রাজ সিংকে। সোমবার তাঁদের আদালতে পেশ করা হয়। এই ঘটনায় তিন অভিযুক্তকে ১৩ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় বারাসত আদালত।
চন্দ্রনাথ হত্যার তদন্তে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্তকারী সিট গঠন করা হয়েছে। সেই সিটে রয়েছেন এসটিএফ এবং রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডির অভিজ্ঞ আধিকারিকেরা। তদন্তকারীদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডে যে ধরনের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির ছাপ মিলেছে তাতে এর পিছনে একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। গত ৬ মে রাতে মধ্যমগ্রামে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ঘটনা। চন্দ্রনাথের গাড়ি সামনে আচমকা এসে দাঁড়ায় অন্য একটি চারচাকার গাড়ি। বাধ্য হয়ে গাড়ি থামাতেই দুদিক থেকে বাইকে চেপে হাজির হয় দুষ্কৃতীরা। মুহূর্তের মধ্যে চন্দ্রনাথ ও তাঁর গাড়ির চালককে লক্ষ্য করে শুরু হয় এলোপাথাড়ি গুলি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় চন্দ্রনাথের। গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁর চালককে।
ঘটনার পরেই তদন্তে নেমে পুলিশ খুনে ব্যবহূত গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করে। পরে উদ্ধার হয় আততায়ীদের ব্যবহূত দুটি বাইকও। তদন্তে উঠে এসেছে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গাড়ি এবং বাইক দুটিরই নম্বরপ্লেট ছিল ভুয়ো। ফলে গোটা অপারেশটি যে অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে চালানো হয়েছিল তা নিয়ে প্রায় নিশ্চিত তদন্তকারীরা। এখন তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য একটাই এই খুনের মাস্টারমাউন্ডের কাছে পৌঁছানো। কারণ তাঁর পরিচয় সামনে এলেই স্পষ্ট হতে পারে এই হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য। কার নির্দেশে এত বড় হামলার ছক কষা হয়েছিল আর সেই উত্তর খুঁজতেই এখন একের পর এক রাজ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে তদন্তকারী দল। গোটা রাজ্যের নজর এখন এই তদন্তের দিকে। চন্দ্রনাথ খুনে আসল দোষীরা ধরা পড়ুক, শাস্তি পাক এই দাবিই জানিয়েছে চন্দ্রনাথের পরিবার।