সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : একসময় ভারতের কর্পোরেট দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম ছিল মুকেশ অম্বানি বনাম গৌতম আদানি। টেলিকম থেকে বন্দর,গ্রিন এনার্জি থেকে ডেটা সেন্টার- প্রায় প্রতিটি বড় সেক্টরেই ছিল দুই শিল্পগোষ্ঠীর সরাসরি লড়াই। কিন্তু এবার ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ধীরে ধীরে কি সহযোগী হয়ে উঠছেন ভারতের দুই শীর্ষ ধনকুবের? কারণ সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় চুক্তি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি এবং শক্তিক্ষেত্রে Reliance Industries এবং Adani Group-এর নতুন সমঝোতা এখন গোটা কর্পোরেট বাজারে বড় আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন উঠছে- এটা কি শুধু ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য সাময়িক সমঝোতা? নাকি ভারতের এনার্জি মার্কেটে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ‘সুপার অ্যালায়েন্স’? আর এই জোটের প্রভাব সাধারণ গ্রাহক, ছোট ব্যবসা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর উপর কতটা পড়তে পারে?

প্রথমেই আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে- জ্বালানি খাতে যৌথ ব্যবসা। সম্প্রতি এমন এক চুক্তি হয়েছে যেখানে জিও-বিপি এবং আদানি টোটাল গ্যাস একে অপরের অবকাঠামো ব্যবহার করবে। অর্থাৎ এখন অনেক Jio-bp পেট্রোল পাম্পে পাওয়া যাবে Adani Total Gas-এর সিএনজি পরিষেবা। আবার আদানির ফুয়েল স্টেশনেও বিক্রি হবে জিও-বিপির প্রিমিয়াম পেট্রোল ও ডিজেল। সহজ ভাষায় বললে- আগে যেখানে আলাদা আলাদা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হত, এখন দুই সংস্থা সেই অবকাঠামো ভাগ করে ব্যবহার করছে। এতে জমি কেনা, নতুন স্টেশন তৈরি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ ভারতের জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ দেশে এখন সিএনজি, ইভি চার্জিং এবং বিকল্প জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে যে সংস্থা দ্রুত বেশি সংখ্যক জায়গায় পৌঁছতে পারবে, বাজারে তার দখলও তত বাড়বে। আর এখানেই একসঙ্গে কাজ করে নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে অম্বানি ও আদানি গোষ্ঠী।
এবার আসা যাক বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালে রিলায়্যান্স একটি বড় পদক্ষেপ নেয়। আদানি পাওয়ারের অধীনস্থ সংস্থা Mahan Energen Ltd-এ প্রায় ২৬ শতাংশ শেয়ার কেনে রিলায়্যান্স। এই চুক্তির মাধ্যমে রিলায়্যান্স দীর্ঘমেয়াদে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ নিজেদের শিল্প, ডেটা সেন্টার বা ভবিষ্যতের প্রকল্প চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা আগেভাগেই করে ফেলছে রিলায়্যান্স।
এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে শুধু ব্যবসা বড় হলেই হয় না, তার জন্য লাগাতার বিদ্যুৎ এবং শক্তির জোগানও দরকার। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, এআই প্রযুক্তি, ৫জি পরিষেবা এবং বড় শিল্প প্রকল্প চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে আদানি গোষ্ঠীর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আর রিলায়্যান্সের প্রযুক্তি ও শিল্প নেটওয়ার্ক- এই দুই একসঙ্গে এলে বাজারে তাদের প্রভাব আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এই জোট ঘিরে উদ্বেগও কম নয়। কারণ অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, ভারতের অর্থনীতির বড় অংশ যদি ধীরে ধীরে কয়েকটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তাহলে ছোট ব্যবসা এবং নতুন সংস্থাগুলির পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিকম, ডেটা এবং খুচরো বাজার— সব জায়গাতেই যদি একই কয়েকটি সংস্থার দখল বাড়তে থাকে, তাহলে বাজারে ‘ডুয়োপলি’ বা দুই বড় খেলোয়াড়ের আধিপত্য তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সরকারি সংস্থাগুলির উপর চাপ। এতদিন জ্বালানি ও শক্তিক্ষেত্রে Indian Oil, BPCL, HPCL-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বড় প্রভাব ছিল। কিন্তু এখন বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাগুলি একসঙ্গে শক্তি বাড়ালে সেই প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পেট্রোল পাম্প, সিএনজি নেটওয়ার্ক, গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি আধিপত্য আরও বাড়তে পারে।
তবে এটাও ঠিক, অম্বানি এবং আদানি পুরোপুরি বন্ধু হয়ে গিয়েছেন- এমনটা বলা এখনও তাড়াহুড়ো হবে। কারণ সবুজ শক্তি বা Green Energy সেক্টরে এখনও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। গুজরাতে সৌরশক্তি, হাইড্রোজেন প্রকল্প এবং ডেটা সেন্টার ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করছে দুই পক্ষই। অর্থাৎ একদিকে সহযোগিতা, অন্যদিকে প্রতিযোগিতা- দুটোই চলছে পাশাপাশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশল আসলে আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রেও খুব পরিচিত। যেখানে প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা, আর যেখানে বাজার দখলের সুযোগ সেখানে প্রতিযোগিতা। এতে সংস্থাগুলি নিজেদের খরচ কমাতে পারে, দ্রুত বাজার বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলাও করতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর প্রভাব কী হতে পারে? একদিকে গ্রাহকরা হয়তো আরও বেশি পরিষেবা, দ্রুত নেটওয়ার্ক এবং উন্নত জ্বালানি অবকাঠামো পাবেন। কিন্তু অন্যদিকে যদি বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বড় কর্পোরেটদের হাতেই চলে যেতে পারে। ফলে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসে এটা এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। যারা একসময় একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, তারাই এখন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে একসঙ্গে কাজ করছেন। আর এই জোট শুধু দুই শিল্পপতির ব্যবসা নয়, আগামী দিনের ভারতের জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং খুচরো বাজারের ভবিষ্যৎও অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে। এখন দেখার- এই সহযোগিতা কত দূর যায়, আর তার প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে ঠিক কতটা গভীর হয়।