মনের মতো খেলা। বিশ্বকাপের ঠিক এমনই এক লড়াইয়েরই দরকার ছিল। এমন এক ম্যাচ যেখানে শুধু জয়ী দল নয়। পরাজিতরাও মাথা উঁচু করে মাঠে ছাড়ে। যেখানে স্কোরলাইন শুধু ফলাফল জানায়। মাঠের লড়াই তো ইতিহাস হয়ে থাকে। মায়ামির সেই রাত ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনেকদিন বেঁচে থাকবে। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্তিনার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের দেশটি দেখিয়ে দিল যে সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে যে লড়াই উপহার দিল তা বহুদিন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোশোয় উঠেছে আর্জেন্তিনা। সম্মান, ভালোবাসা আর প্রশংসা কুড়িয়েছে কেপ ভার্দেও। এই ম্যাচের পর একটাই কথা বলতে হয় হ্যাটস অফ টু কেপ ভার্দে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল কেপ ভার্দে সহজে হার মানতে আসেনি। তারা নিজেদের রক্ষণকে শক্তিশালী রেখে আর্জেন্তিনার আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে লিওনেল স্কালোনির দল বলের দখল ধরে রাখলেও প্রথমদিকে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। উইং দিয়ে আক্রমণ সেভাবে সফল হচ্ছিল না। ফলে মাঝমাঠে বল ঘুরলেও কেপ ভার্দের সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবে বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়রাই পার্থক্য গড়ে দেন। ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অসাধারণ লম্বা পাস নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের চিরচেনা বাঁ-পায়ের শটে গোল করেন লিওনেল মেসি। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭ এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে মোট গোল হয় ২০। আবারও প্রমাণ করে দিলেন যে সুযোগ যত ছোটই হোক মেসির মতো ফুটবলারের কাছে সেটাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গোল হজম করার পর ভেঙে পড়েনি কেপ ভার্দে। বরং দ্বিতীয়ার্ধে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বলের দখল বাড়িয়ে আর্জেন্তিনার রক্ষণে একের পর এক আক্রমণ শুরু করে। ৬০ মিনিটে ডুয়ার্তের শক্তিশালী শটে সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে এমন দুর্দান্ত ফিনিশ পুরো দলকে নতুন উদ্দীপনা এনে দেয়। ম্যাচ তখন সম্পূর্ণ নতুন মোড় নেয়। আর্জেন্টিনা বুঝতে পারে এই প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে কর্নার থেকে আসা বলে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করে আবার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। রক্ষণে দৃঢ়তা এবং আক্রমণ দুই দিকেই অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন তিনি। কেপ ভার্দে আবারও দেখিয়ে দেয় তাদের হার না মানা মানসিকতা। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেজ কাব্রালের অনবদ্য কার্লিং শটে আবার সমতা ফেরে। সেই গোল ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। মনে হচ্ছিল কেপ ভার্দে যেন অসম্ভবকেও সম্ভব করে ফেলবে।
শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে ডিনের আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্তিনা। এই জয়ের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিলেও ম্যাচটি তাদের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। বরং কেপ ভার্দে শেষ পর্যন্ত এমন লড়াই করেছে যে আর্জেন্তিনাকে পুরো ১২০ মিনিট নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হয়েছে।
এই ম্যাচে লিওনেল মেসি শুধু গোলই করেননি আক্রমণের প্রতিটি মুহূর্তে দলের প্রধান ভরসা ছিলেন। তাঁর চলতি বিশ্বকাপের সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপে মোট ২০ গোলের মাইলফলক তাঁর অসাধারণ ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। একথায় বলা যায় ‘বুড়ো আছে পুরো ফর্মে’।
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফরমার। একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল ও রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজও শেষ দিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তবে আর্জেন্তিনার রক্ষণভাগ এই ম্যাচে একাধিকবার চাপের মুখে পড়ে ও দু’বার লিড হারানো ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। ফলে স্কালোনিকে পরবর্তী ম্যাচের আগে কিছু পরিবর্তনের কথা ভাবতেই হবে।
অন্যদিকে, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা এই ম্যাচের অন্যতম বড় নায়ক। ৪০ বছর বয়সেও তিনি সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মেসির একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দিয়ে তিনি গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। শুধু গোলরক্ষক হিসেবেই নয়। দলের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ডুয়ার্তে, কাব্রাল ও কেপ ভার্দের গোটা দল দেখিয়ে দিয়েছে সাহস ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বড় দলগুলোকেও কঠিন পরীক্ষায় ফেলা যায়। ফুটবলে অনেক সময় পরাজয়ও ইতিহাস হয়ে যায়। কেপ ভার্দে সেই ইতিহাসই লিখল। তারা হয়তো শেষ ষোলোয় উঠতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বকে শিখিয়ে গেল ছোট দেশ মানেই ছোট স্বপ্ন নয়। অন্যদিকে আর্জেন্তিনা জয় পেয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছেছে । সামনে তাদের অপেক্ষায় আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে এই ম্যাচ স্কালোনির দলকে মনে করিয়ে দিয়েছে বিশ্বকাপে কোনও প্রতিপক্ষকেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। আগামী ৭ জুলাই ভারতীয় সময় রাত ৯.৩০ টায়। শেষ ষোলায় তাদের প্রতিপক্ষ মিশর। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা কি আরও এক ধাপ এগিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে পারবে। নাকি অন্য চমক থাকবে। সেই উত্তর মিলবে মাঠেই।