সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ রুখতে এবং পাকিস্তানের মাটিতে চলা ভারত-বিরোধী নেটওয়ার্ক ভাঙতে আরও এক বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। পাকিস্তানের মাটিতে বসে জম্মু-কাশ্মীরের নাশকতা, অনুপ্রবেশ, অস্ত্র সরবরাহ এবং জঙ্গি নিয়োগের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা আরও ২৩ জন কুখ্যাত অপরাধীর না উঠল ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক শনিবার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা UAPA-এর অধীনে এই ২৩ জন পাকিস্তানি জঙ্গিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে ঘোষণা করেছে।
এই নতুন ২৩ জনের তালিকায় লস্কর-ই-তৈবা ও জইশ-ই-মহম্মদ-এর মতো কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনের প্রথম সারির নেতারা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ভারতের মাটিতে একাধিক নাশকতার মাস্টারমাইন্ড তথা লস্কর প্রধান হাফিজ সঈদের তিন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সাগরেদ।
অতীতে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র কোনও সংগঠনকে নিষিদ্ধ বা জঙ্গি সংগঠন হিসাবে ঘোষণা করা যেত। কিন্তু ২০১৯ সালে অগাস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকার UAPA আইনে সংশোধন আনে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেও সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা পায় কেন্দ্র। এই তকমা পাওয়ার ফলে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো ওই অপরাধীদের অস্ত্র ও অর্থ জোগানের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে এবং ভারতের মাটিতে থাকা তাদের সমস্ত সম্পত্তি বা অ্যাসেট বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
এই নতুন ২৩টি নাম যুক্ত হওয়ার পর, ভারতের এই বিশেষ মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা মোট ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৮০ জনে। এই তালিকায় ইতিমধ্যেই হাফিজ সঈদ, জইশ প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহার, ২৬/১১ মুম্বই হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড জাকি-উর-রহমান লাখভি, আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম এবং আমেরিকাতে থাকা খলিস্তানি নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনের মতো নামগুলো রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, লস্কর প্রধান হাফিজ সঈদের যে তিন ঘনিষ্ঠ সাগরেদকে এই তালিকায় আনা হয়েছে, তারা হল আব্দুল রউফ (লস্কর এবং জামাত-উদ-দাওয়ার প্রবীণ সদস্য), হাফিজ খালিদ ওয়ালিদ (লস্করের শীর্ষস্তরের নেতা) এবং রানা ইফতিখার। এই রানা ইফতিখারের মূল কাজই হল জিহাদি কার্যকলাপের কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় সাধন করা এবং উপত্যকার যুবকদের মগজধোলাই করে জঙ্গি কার্যকলাপে উসকানি দেওয়া।
পাশাপাশি, জইশ-ই-মহম্মদের একঝাঁক চাঁইকেও এই তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরি। পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে নিজের নেটওয়ার্ক চালানো এই মাসুদ ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল জম্মুর সুঞ্জওয়ানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর জইশের আত্মঘাতী হামলার নেপথ্যে ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরি ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। সে কাশ্মীরি যুবকদের মগজধোলাই করে জইশে নিয়োগ করত, তাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিত এবং ভারতে অনুপ্রবেশে সাহায্য করত।
তালিকায় রয়েছে মহম্মদ মুসাদ্দিক ওরফে ডক্টর। এই মুসাদ্দিক ভারতে পাকিস্তানি জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ করানোর মূল হ্যান্ডলার। সুঞ্জওয়ান হামলায় যুক্ত থাকার পাশাপাশি ভারতের আধুনিক প্রযুক্তির মাথাব্যথার কারণ সে নিজেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুসাদ্দিক ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকে দেদার অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচার করত। শুধু তাই নয়, জইশের একটি হাইটেক সাইবার টিম পরিচালনা করে সে, যারা ফেসবুক, টেলিগ্রামের মতো বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভারতীয় যুবকদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা চালায়।
এছাড়াও জইশ-ই-মহম্মদের আরেক শীর্ষ কমান্ডার মুফতি মহম্মদ আসগর খান ওরফে আবু সাদের নামও রয়েছে এই তালিকায়। জম্মু ও কাশ্মীরে জইশ জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ করানোর লঞ্চিং কমান্ডার হিসেবে কাজ করে সে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর জম্মুর নাগরোটায় ভারতীয় সেনার ক্যাম্পে যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছিল, এই আবু সাদই ছিল তার অন্যতম মূল চক্রী বা মাস্টারমাইন্ড।
এই তালিকা প্রকাশের পরেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক্স-এ একটি পোস্টে জানান, ভারত ও তার নাগরিকদের রক্ষা করতে মোদী সরকার প্রতিটি জঙ্গি মডিউলকে ভেঙে ফেলতে বদ্ধপরিকর। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২৩ জন ভয়ঙ্কর জঙ্গিকে UAPA আইনের অধীনে জঙ্গি ঘোষণা করেছে। এদের মধ্যে ১৭ জন পাকিস্তানি এবং ৬ জন ভারতীয়। তবে সকলেই পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর থেকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছে।
দিল্লির এই কড়া পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তানের ওপর চাপ আরও বাড়ল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।