বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার নদী-জঙ্গল ঘেরা সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আবাস যোজনা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে আরও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক করলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।

মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার পঞ্চায়েত দফতরের আধিকারিক, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্তা এবং জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আবাস যোজনার সমীক্ষার অগ্রগতি, পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক প্রকল্প, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার পরিকাঠামো এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রী জানান, সুন্দরবনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখনও বহু এলাকায় সরকারি প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নদী, খাঁড়ি ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৩০০-রও বেশি পঞ্চায়েত রয়েছে। অনেক এলাকায় পৌঁছতে নৌপথই একমাত্র ভরসা। সেই কারণে এখনও পর্যন্ত সব পঞ্চায়েতে আবাস যোজনার সমীক্ষার কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
মন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের আধিকারিক এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সমীক্ষার কাজ সম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যেই আবাস যোজনার সমীক্ষার কাজ শেষ হবে এবং প্রকৃত উপভোক্তাদের তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক এবং জনমুখী করে তুলতে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। অতীতে মানুষের ছোটখাটো কাজের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে দ্রুত পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, সেই বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পঞ্চায়েতমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পঞ্চায়েতের বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সেই কারণেই কেন্দ্র সরকার অনেক প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছিল বলে তাঁর দাবি। বর্তমানে স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনার ফলে সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আগামী আগস্ট মাসের পর থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ আরও দ্রুত এগোবে বলেও তিনি আশাবাদী।
সুন্দরবনের মানুষের কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু পরিবার জীবিকা হারায়। ফলে বাধ্য হয়ে এলাকার অসংখ্য যুবক-যুবতী ও শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে চলে যান। এই প্রবণতা কমাতেই সরকার স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ৩০০-রও বেশি উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলিতে দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় ধরনের শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। গ্রামীণ এলাকার মানুষ যাতে নিজের এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং পরিবার ছেড়ে অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য না হন, সেই লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে কাজের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ১০০ দিনের কাজ ছিল, বর্তমানে তা ১২৫ দিনে উন্নীত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এর ফলে গ্রামীণ মানুষের হাতে আরও বেশি কাজ এবং আয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকারের আশা।
বৈঠকে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এই অঞ্চলের মানুষের উপর। তাই আবাসন, রাস্তা, পানীয় জল, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জীবিকা সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈঠকের শেষে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার পঞ্চায়েত আধিকারিকদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের নির্দেশও দেন তিনি। সরকারের লক্ষ্য, সুন্দরবনের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।
এই বৈঠককে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সুন্দরবনের মতো ভৌগোলিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ অঞ্চলে উন্নয়ন, আবাসন এবং কর্মসংস্থানকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।