সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভারতের শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরকারের অন্যতম জনপ্রিয় সেভিংস স্কিম- সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা। ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ২০১৫ সালে এই প্রকল্প চালু করে কেন্দ্র। লক্ষ্য ছিল- মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে পরিবারকে সঞ্চয়ের দিকে এগিয়ে দেওয়া। এই স্কিমে আজও মানুষ আস্থা রাখছেন কারণ এখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে, ধাপে ধাপে সেভিং এবং কর ছাড়ের সুবিধাও রয়েছে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায়।

সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা
এটি একটি স্মল সেভিংস স্কিম যেখানে কন্যা সন্তানের নামে পরিবার সঞ্চয় করতে পারে। ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে খুব সহজে। মাত্র ২৫০ টাকা দিয়েই শুরু করা যায় এই স্কিম।
এই যোজনায় প্রতি বছর সর্বাধিক ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জমা দেওয়া যায়, এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা হল- অ্যাকাউন্টে যে টাকা জমা হচ্ছে, সুদ হিসাবে যে টাকা পাচ্ছেন এবং পরিশেষে যেই পরিমাণ টাকা মিলবে- সবটাই পুরোপুরি ট্যাক্স ফ্রি। অর্থাৎ এক কথায়, এই স্কিম EEE ক্যাটাগরির, ভারতের সবচেয়ে বড় কর ছাড় সুবিধার স্কিমগুলির একটিতে পরিণত হয়েছে।
সুদের হার
২০২৪ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে সুকন্যায় সুদের হার ৮.২%, এবং সুদ প্রতিবছর কম্পাউন্ড হয়। চাইলে মাসিক ভিত্তিতে সুদের রিটার্ন হিসেব করেও পাওয়া যায়।
কে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন?
কন্যা সন্তানের মা-বাবা বা আইনগত অভিভাবক
জন্মের ১০ বছরের মধ্যে অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে
একজন কন্যা সন্তানের নামে একটাই অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে
সাধারণভাবে সর্বাধিক ২ মেয়ের নামে একাউন্ট খোলা যায়

ডিপোজিট নিয়ম
বছরে কমপক্ষে ২৫০ টাকা দিতে হবে। সর্বাধিক ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ডিপোজিট করা যাবে। জমা দেওয়া যাবে জন্মের প্রথম বছর থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। তারপর অ্যাকাউন্ট থাকবে মোট ২১ বছর। অর্থাৎ-
১৫ বছর টাকা জমা → বাকি ৬ বছর টাকা সুদে বেড়ে উঠবে
ধরা যাক, আপনি প্রতি মাসে জমা ১০০০ টাকা জমা দিলেন-
প্রতি মাসে জমা = ১০০০ টাকা
বছরে মোট জমা = ১২,০০০ টাকা
মোট সময় = ১৫ বছর
সুদের হার = ৮.২%
অর্থাৎ, ১৫ বছর ধরে প্রতি বছর ১২০০০ টাকা জমা দিলে মোট জমা হবে-
১২০০০ × ১৫ = ১,৮০,০০০ টাকা
এবং ৮.২% সুদে কম্পাউন্ড হওয়া অনুযায়ী ম্যাচিউর হওয়ার পর মোট টাকার পরিমাণ হবে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা।
ম্যাচিউরিটি ও টাকা তোলার নিয়ম
অ্যাকাউন্ট ২১ বছরে ম্যাচিওর হবে। তবে মেয়ের ১৮ বছর বয়সের পর বিয়ে হলে অ্যাকাউন্ট আগেই বন্ধ করা যায়। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৮ বছর বয়সে বা ক্লাস ১০ পাশের পর ৫০% টাকা তোলা যায়। শর্ত- অ্যাডমিশনের প্রমাণ, রসিদ ইত্যাদি জমা দিতে হবে। এছাড়াও চিকিৎসা, মৃত্যু, আর্থিক দুরবস্থার ক্ষেত্রে বিশেষ নথি জমা দিয়ে আগাম বন্ধ করা যায়।
কেন জনপ্রিয় সুকন্যা?
কারণ এতে- সরকার গ্যারান্টি দেয় টাকার, কোনও মার্কেট রিস্ক নেই, সুদ বেশ আকর্ষণীয়, ট্যাক্স পুরোপুরি ছাড়, কন্যা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিনিয়োগ। এক কথায়- মেয়ের ভবিষ্যৎ আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা।
যদি প্রতি বছর সর্বোচ্চ অর্থাৎ ১.৫ লক্ষ টাকা করে ১৫ বছর জমা দেওয়া হয়, তাহলে-
মোট জমা: ২২.৫০ লক্ষ টাকা
২১ বছরে ধরে সুদে টাকা দাঁড়াবে প্রায় ৪০.৬৮ লক্ষ টাকার বেশি
এই টাকা পরে কন্যা সন্তানের- উচ্চশিক্ষা, বিবাহ এবং নিজের ক্যারিয়ারে অথবা যে কোনও বড় কাজে ব্যবহার করা যাবে।

অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য কী দরকার?
মেয়ের জন্ম সার্টিফিকেট, অভিভাবকের পরিচয়পত্র- আধার/ভোটার/ড্রাইভিং লাইসেন্স,প্যান কার্ড ঠিকানার প্রমাণ,পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
কোথায় অ্যাকাউন্ট খোলা যায়?
ভারতের যে কোনও পোস্ট অফিসে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে, অনুমোদিত প্রাইভেট ব্যাঙ্কগুলিতেও খোলা যায়। এমনকি চাইলে অ্যাকাউন্ট ভারতজুড়ে যেকোনও জায়গায় ট্রান্সফারও করা সম্ভব।
গণনার সুবিধা
আজকাল অনলাইনে সুকন্যা ক্যালকুলেটরও রয়েছে।
এর সাহায্যে- কত টাকা জমা দিলে ভবিষ্যতে কত পাবেন, কত বছর পর কত সুদ দাঁড়াবে, কন্যা সন্তানের ভবিষ্যতের বাজেট কেমন হবে সবই কয়েক সেকেন্ডে হিসেব করা যায়।
সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা আজ ভারতের অনেক পরিবারকে কন্যার ভবিষ্যৎ গঠনে সাহস দিচ্ছে। সামান্য সঞ্চয়, দীর্ঘমেয়াদে বড় মূলধন, তাও আবার পুরোপুরি নিরাপদ ও করমুক্ত। কন্যা সন্তানের স্কুলজীবন থেকে কলেজ, বিয়ে- এক স্কিমেই ভবিষ্যতের সব খরচের শক্ত ভিত গড়তে পারে সুকন্যা। যে কারণেই এই স্কিমকে অনেকেই বলছেন- দেশের মেয়েদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক ঢাল এই যোজনা।