অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : মধ্যমগ্রামের বুকে দিনের আলোয় ঘটেছিল এইরকম ঘটনা। যা ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায় রাজনৈতিক মহলে। কে বা কারা এই ঘটনার নেপথ্যে, তা জানতে শুরু হয় জোরদার তদন্ত। প্রথমে রাজ্য পুলিশের হাতে তদন্ত থাকলেও, মামলার গুরুত্ব ও রাজনৈতিক চাপানউতোরের আবহে তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। তারপর থেকেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসতে শুরু করেছে তদন্তে। ছক কষা হয়েছিল অনেক আগেই। সুপারি কিলার, ভুয়ো নম্বর প্লেট, একাধিক রাজ্য জুড়ে যোগাযোগ। মিলিয়ে গোটা অপারেশন ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। ধৃতদের জেরা করে উঠে এসেছে ঘটনায়. ব্যবহৃত গাড়ির গতিপথ থেকে শুরু করে পালানোর রুটের খুঁটিনাটি তথ্য। আর সেই সূত্র ধরেই এবার তদন্তকারীদের নজরে উঠে এসেছে একাধিক নতুন নাম

হাইভোল্টেজ কেসে কোমর বেঁধে এবার নামল সিবিআই। অপরাধের গোড়ায় পৌঁছাতে তৎপর তদন্তকারীরা। শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ খুনে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। ধৃত মায়াঙ্ককে জেরায় উঠে এসেছে খুনে ব্যবহৃত গাড়ি সংক্রান্ত তথ্য। শুধু গাড়ি পৌঁছনোর জন্য ১ লক্ষ টাকার ডিল হয়। সেই ব্যক্তির সঙ্গে ডিল করা হয় গাড়ির নম্বর প্লেট বদলে ঝাড়খণ্ড থেকে পৌঁছে দিতে হবে বারাসত। মায়াঙ্ককে জেরায় বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে সিবিআই। বিশেষভাবে নজরে রয়েছে ঝাড়খণ্ডের এক ব্যক্তির। এই ব্যক্তিই মায়াঙ্ককে বরাত দিয়েছিলেন, যাতে নিসান মাইক্রা গাড়িটি বারাসতে পৌঁছে দেন মায়াঙ্ক। মধ্যমগ্রামের ঘটনার দিন অভিযুক্তরা নিসান মাইক্রা গাড়িতে চেপেই পৌঁছন ঘটনাস্থলে। সিবিআই জেরায় মায়াঙ্ক দাবি করেছেন, ১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তিনি গাড়ি বারাসতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মায়াঙ্ক নিজেই চারচাকা গাড়িটি চালিয়ে পৌঁছে দেন বারাসতে। হাওড়ায় নিবেদিতা টোল প্লাজার কয়েক কিলোমিটার আগে গাড়ি থামিয়ে বদলে ফেলা হয়েছিল নম্বর প্লেট। লাগানো হয়েছিল শিলিগুড়ির আরওটিও থেকে রেজিস্ট্রেশন হওয়া একটি গাড়ির নম্বর। নিবেদিতা টোল প্লাজার কাছাকাছি এসে টোল পেরনোর আগেই ফেলে দেওয়া হয় গাড়ির আসল নম্বর প্লেট। অভিযুক্ত মায়াঙ্ককে নিয়ে একাধিক জায়গা ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে সিবিআই। মায়াঙ্ককে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, তাঁকে বারাসত ১১ নম্বর রেল গেট সংলগ্ন নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি রেখে চলে যেতে বলা হয়। নিবেদিতা টোল প্লাজা পেরনোর পর বারাসত ১১ নম্বর রেল গেট সংলগ্ন এলাকায় গাড়ি রেখে বেরিয়ে যান মায়াঙ্ক।
তাই মায়াঙ্ককে নিয়ে সিবিআই গোয়েন্দারা প্রথমে যান বারাসত ১১ নম্বর রেল গেটের কাছে। সেখানে দীর্ঘক্ষণ ছিলেন তাঁরা। ঠিক এই জায়গা থেকেই খুনে জড়িত সন্দেহে এক মোটরবাইক বাজেয়াপ্ত করেছিল পুলিশ। যদিও মোটরবাইকের মালিকানা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। সেখান থেকে সিবিআই তদন্তকারীরা পৌঁছে যান বিমানবন্দরের কাছের এক ফাস্টফুডের দোকানে। বারাসত থেকে একটি বাসে চেপে মায়াঙ্ক চলে যান এয়ারপোর্ট এলাকায়। সেখানে এই ফাস্ট ফুডের দোকানে খাওয়াদাওয়া করে ক্যাব নিয়ে চলে যান হাওড়া স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে ফিরে যান বক্সার। সিবিআই জেরায় মায়াঙ্ক আরও জানান, টোল প্লাজায় তিনি অনলাইন পেমেন্ট করে টোল মিটিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার মায়াঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে এইসব জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন সিবিআই-এর তদন্তকারীরা।

চন্দ্রনাথকাণ্ডে উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। একমাস আগে থেকে পুরো ছক করা হয়েছিল। সিগন্যাল অ্যাপে আততায়ীরা এই চক্রান্তের প্ল্যান করেছিল। তিনজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আরেক মাথার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এই মধ্যমগ্রামের বড় মাথাই ঠিক করেছিল কবে কখন চন্দ্রনাথের সঙ্গে করা হবে চরম পরিণতি । এই সুপারি কিলারদের ৭০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল খুনের জন্য। এই ব্যক্তির খোঁজ জানতে পারলেই এই খুনের মোটিভ কী তা সহজেই বোঝা যাবে। তাঁকে গ্রেফতার করতে পারলেই বোঝা যাবে এটা ব্যক্তিগত শত্রুতা না কি, রাজনৈতিক কোনও কারণে এই খুন । ইতিমধ্যেই ৭ সদস্যের তদন্তকারী দল অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই ব্যক্তির খোঁজ পেয়েছে। তার খোঁজে বিভিন্ন রাজ্যে তল্লাশি অভিযান চলছে।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরও জটিল যোগসূত্র। দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল রেকি, বদলানো হয়েছিল গাড়ির নম্বর প্লেট, পালানোর রুটও ছিল আগে থেকেই নির্দিষ্ট। তদন্তকারীদের অনুমান, গোটা অপারেশন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছিল। শুধুমাত্র সুপারি কিলার নয়, এর পিছনে সক্রিয় ছিল একাধিক স্তরের নেটওয়ার্ক। আর সেই কারণেই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে ‘মাস্টারমাইন্ড’-এর খোঁজ। ইতিমধ্যেই তল্লাশি শুরু করেছে সিবিআই। ধৃতদের জেরা করে মিলছে নতুন নতুন তথ্য। আর সেই সূত্র ধরেই তদন্তকারীদের দাবি, খুব শীঘ্রই এই খুনের নেপথ্যের আসল কারণ সামনে আসতে পারে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। চন্দ্রনাথকাণ্ডে মোটিভ ঘিরে ধোঁয়াশা এখনও কাটেনি। তবে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে। এটি কোনও আকস্মিক হামলা নয়, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কষা এক সুপরিকল্পিত হত্যার ছক।