নাম সীমা খন্না। নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল। কিন্তু হঠাৎ কেন তাঁকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে এত চর্চা? কেন তাঁর কাজের উপর নজরদারির জন্য নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হল সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারকে? ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট, এবার থেকে সীমা খন্নাকে সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার পবন কুমার শর্মার অধীনে কাজ করতে হবে। আইটি এবং আইসিটি সংক্রান্ত সমস্ত ফাইলও জমা দিতে হবে তাঁর মাধ্যমেই। অর্থাৎ, আইটি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কাজকর্মে থাকছে ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের নজরদারি।

এই নির্দেশিকার নেপথ্যে রয়েছে তিন মাস আগের এক বিতর্ক। গত ২৮ জুলাই নির্বাচন কমিশনের কাজের দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত নির্দেশিকায় বদল আনা হয়েছিল। সেই নির্দেশে আইটি এবং আইসিটি বিভাগের দায়িত্ব সীমা খন্নার হাতে রাখা হলেও, তৎকালীন ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার সঞ্জয় কুমারের অধীনে থাকা নজরদারি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সরাসরি কমিশনের কাছে রিপোর্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আপত্তি তোলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী। অভিযোগ, কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই এই নির্দেশিকা জারি করেছিলেন সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার মনীশ গর্গ।
২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি লেখেন দুই নির্বাচন কমিশনার। তাঁদের অভিযোগ, কমিশনের মধ্যে আলোচনা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের রদবদল করা হয়েছিল। এমনকী, সংশ্লিষ্ট ফাইল চাওয়া হলেও তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর ৩০ জুলাই যৌথ অভ্যন্তরীণ নির্দেশ জারি করেন দুই নির্বাচন কমিশনার। সেখানে বলা হয়, কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে একমত না হওয়া পর্যন্ত আগের ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে। নির্বাচন কমিশনও পরে সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানায়, ৩০ জুলাইয়ের যৌথ নির্দেশের কারণেই ২৮ জুলাইয়ের বিতর্কিত নির্দেশিকা বাস্তবায়িত হয়নি।
কিন্তু সীমা খন্নার আইটি বিভাগ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ, নির্বাচন কমিশনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পরিচালনার দায়িত্ব এই বিভাগের হাতে। ECINET এবং ERONET-এর মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী পরিষেবার কাজ। ECINET-এর মাধ্যমে নাগরিকেরা নির্বাচনী পরিষেবা পান। অন্যদিকে, ERONET-এর মাধ্যমে নির্বাচনী আধিকারিকেরা ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা করেন। আর এই ERONET-এর অ্যাক্সেস নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন।
বিশেষ করে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের সময় এই অভিযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে, কার নাম বাদ যাবে, নাম সংযোজন বা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। ECINET প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটার যাচাই প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
৪ নভেম্বরের নতুন নির্দেশিকায় সীমা খন্নার রিপোর্টিং কাঠামো আরও স্পষ্ট করে দিল কমিশন। পবন কুমার শর্মার হাতে দেওয়া হয় আইটি, আইসিটি, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী ব্যয় নীতি এবং অবজারভার বিভাগের দায়িত্ব। অন্যদিকে, মনীশ গর্গের হাতে থাকছে ইলেকশন প্ল্যানিং, ইভিএম ইলেকশন ডেটাবেস ম্যানেজমেন্ট এবং উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ের দায়িত্ব। তাঁকে নির্বাচনী পরিকল্পনার কাজে সহযোগিতা করবেন ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার প্রকাশ রাজপুরোহিত।
একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যাক্সেস নিয়ে প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ, আর সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে সংঘাত। সব বিতর্কের মাঝখানে বারবার উঠে আসছে একটি নাম, সীমা খন্না। তবে নতুন নির্দেশিকা কি সত্যিই আইটি বিভাগের কাজের উপর নজরদারি আরও শক্ত করল? নাকি কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি শুধুই নিয়মমাফিক দায়িত্ব বণ্টন? ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, এখন নজর সেই দিকেই।