আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : তাঁর গান হলেই জোরালো হাততালির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি অরিজিৎ সিং। এহেন গায়কের মাইক্রোফোন থেকে সরে দাঁড়ানোটা বিরল ঘটনা বললেও কম বলা হবে। অরিজিৎ সিং এমন এক শিল্পী, যিনি একটি গোটা প্রজন্মের মনের ভাবপ্রকাশ করেছেন গানের মাধ্যমে। অরিজিৎ, যার দুঃখে ভক্তকুলের হৃদয় ভাঙে। যার গান এক দশক ধরে বলিউডের রোমান্সকে ভাষা জুগিয়েছে।

এহেন শিল্পী সোশ্যাল মিডিয়ায় অকপটে একটি পোস্ট লিখলেন, যা গানের জগতে আলোড়ন তৈরি করেছে। অরিজিৎ সিং ঘোষণা করেছেন, তিনি প্লেব্যাক গানের দুনিয়া থেকে বিরতি নিচ্ছেন। আর কোনও নতুন কাজ নয়, আর নতুন করে কোনও চুক্তি হবে না। একজন ছোট মাপের শিল্পী হয়ে ওঠার আকাঙ্খা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত।
সাধারণ শ্রোতাদের কাছে এটি অবসরের মতো শোনালেও, যারা মুর্শিদাবাদের এই শিল্পীর যাত্রাপথ অনুসরণ করেছেন, তাঁরা মনে করছেন, অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত আসলে শেষ নয়, বরং মুক্তির পথ।
সাফল্যের একঘেয়েমি- অরিজিৎ সিং কোন পথ অনুসরণ করছেন, তা বুঝতে হলে তিনি এর আগে কী করেছেন, তা আমাদের বুঝতে হবে। এক দশকের বেশি সময় ধরে অরিজিৎ সিং-এর গান একঘেয়েমির প্রতীক হয়ে উঠছিল। এটা তাঁর নিজের দোষে নয়, বরং এমন একটি ইন্ডাস্ট্রির দোষ, যারা সোনার ডিম পাড়া হাঁস খুঁজে পেয়েছিল। অরিজিতকে বিশ্রাম দিতে রাজি ছিল না তারা। আশিকি-২ থেকে অ্যানিম্যাল, প্রতিটি বড় বাজেটের চলচ্চিত্রে অরিজিতের কণ্ঠ যেন অপরিহার্য হয়ে উঠছিল। অরিজিৎ নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, তিনি নিজেও বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই বিরক্তি কাটাতে লাইভ শো-তে তিনি নানান পরিবর্তন এনে একঘেয়েমিটা কাটানোর চেষ্টা করতেন। একজন শিল্পী যখন একই ছাঁচে বাঁধা পড়ে যান, তখন আখেরে শিল্পের ক্ষতি হয়। একদিকে বলিউড চেয়েছিল হিট গান। অন্যদিকে অরিজিৎ সিং চেয়েছিলেন গানের মাধ্যমে তাঁর আত্মাকে প্রকাশ করতে । এই দুটো মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এবার প্লে ব্যাক থেকে সরে এসে নিজের সেই চাওয়াটাকেই কার্যত রক্ষা করতে চাইছেন অরিজিৎ সিং।
এবার অরিজিৎ সিংয়ের কেরিয়ার কী?
আরও প্রশ্ন উঠছে, তা হল, যদি অরিজিৎ সিং আর সলমান খান বা রণবীর কাপুরের জন্য গান না করেন, তাহলে তাঁর পরবর্তী কর্মজীবন কেমন হতে চলেছে? আমরা গডফাদার বিহীন একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে অরিজিৎ সিংয়ের জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছি।
১. ওরিয়ন এবং একজন স্বাধীন শিল্পীর জন্ম
অরিজিৎ সিং দীর্ঘদিন ধরেই সঙ্গীত জগতের একাংশের প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন। তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ওরিয়ন মিউজিকের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করা শুরু করেছিলেন। এটা শুধুমাত্র অরিজিৎ সিং নন, বিশ্বব্যাপী বহু শিল্পী নিজস্ব সৃষ্টিতে মজেছেন। এবার সেই পথে হেঁটেই অরিজিৎ সিং চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য বা পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে নিজের পছন্দের, অ-বাণিজ্যিক সুরের জগতে বাঁচতে পারবেন।
২. শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রত্যাবর্তন
প্লেব্যাক থেকে অব্যাহতি ঘোষণা করতে গিয়ে অরিজিৎ সিং বলেছেন, তিনি আরও শিখতে চান। মনের দিক থেকে অরিজিৎ একজন শাস্ত্রীয় সংগীতপ্রেমী। সুতরাং আমরা তাঁর কাছ থেকে এবার এমন কিছু ফিউশন প্রকল্পের আশা করতে পারি, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে আধুনিক প্রযোজনার সঙ্গে মিলিয়ে দেবে। কোক স্টুডিওর কথা ভাবুন, আরও বড় এবং ব্যক্তিগত পরিসরে। বিলবোর্ড চার্টের পিছনে না ছুটে সেইসব ওস্তাদদের অনুসরণ করতে চাইছেন অরিজিৎ সিং, যাঁদের আদর্শে ছোটবেলা থেকে দীক্ষিত হয়ে এসেছেন তিনি।
৩. বন্ধ স্টুডিও থেকে বেরিয়ে লাইভে মনেনিবেশ
প্লেব্যাক গান রোজগারের পথ খুলে দেয়। কিন্তু কনসার্ট একজন কিংবদন্তিকে তৈরি করে। অরিজিৎ সিং ইতিমধ্যেই হাতেগোনা কয়েকজন ভারতীয় শিল্পীর মধ্যে একজন, যিনি বিশ্বজুড়ে ভর্তি স্টেডিয়ামেও কনসার্ট করতে পারেন। প্রযোজকের জন্য বন্ধ স্টুডিওতে একই গানের ১০টি সংস্করণ রেকর্ড করার একঘেয়েমি থেকে মুক্ত হয়ে, অরিজিৎ সিং সম্ভবত আকর্ষণীয় লাইভ অভিজ্ঞতা তৈরিতেই মনোনিবেশ করতে চাইছেন। আশা করা যায় তাঁর আগামী ভ্রমণগুলো আরও পরীক্ষামূলক হবে। যেখানে অরিজিতের জ্যামিং, অ্যাকস্টিক সেট এবং অপ্রচলিত গানের কভার থাকবে।
৪. পরামর্শদাতা
অরিজিৎ সিং-এর প্লেব্যাক থেকে সরে যাওয়াটা পরবর্তী প্রজন্মের প্লেব্যাক গায়কদের জন্য দরজা খুলে দেবে। ভবিষ্যতে তিনি একজন কিংমেকারের ভূমিকা পালন করলেও অবাক হবেন না। তাঁর সংগীত স্কুল এবং প্রযোজনা সংস্থার মাধ্যমে, তিনি এমন একজন পরামর্শদাতা হয়ে উঠতে পারেন, যা এই শিল্পের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
সবমিলিয়ে এটা বলা যেতে পারে যে, আতঙ্কে বলিউড। ‘পরবর্তী অরিজিৎ’-কে খুঁজে বের করার জন্য ছোটাছুটি করবেন প্রযোজকরা। যদিও তা নিষ্ফলা হতে চলেছে, বললেও মন্দ হবে না। কারণ ‘ক্লোনরা’ কখনও টিকে থাকে না।
আমরা সেই প্লেব্যাক গায়ক অরিজিৎ সিংকে বিদায় জানাচ্ছি। যিনি একটি দুর্দান্ত গান গেয়ে সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখতেন। আমরা অরিজিৎ সিংয়ের অপেক্ষায়, যিনি কেবল নিজের আত্মাকে অনুসরণ করে গাইবেন।