গত ২৬ অক্টোবর গুয়াহাটির হোটেল বিলাস ইন-এ ভয়াবহ গুলিকাণ্ডে পাঁচ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হলেন। বুধবার ভোরে অসমের শিবসাগর জেলায় এই ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি এক পুলিশ আধিকারিকের পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন অভিযুক্ত। সেই সময়ই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

এই খবর সামনে আসতেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন মৃত হোটেলের সহ-মালিক ভূদেব ভরালির মেয়ে অঙ্কিতা ভরালি। তাঁর বক্তব্য, অবশেষে ন্যায়বিচার পেলেন তাঁরা। তবে এই খুনের ঘটনায় আর কেউ জড়িত থাকলে বা অভিযুক্তকে কেউ মদত দিয়ে থাকলে, তাদেরও খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাত প্রায় ৩টে ১২ মিনিট নাগাদ গৌরীসাগর থানার অন্তর্গত ফুলপানিচুক এলাকায় এনকাউন্টারের ঘটনাটি ঘটে। গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরে ওই এলাকায় শিবসাগর পুলিশের একটি দল ৩৪ বছর বয়সি ঘনকান্তকে নিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের একটি ব্যাঙ্ক জালিয়াতির মামলায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। শিবসাগরের পুলিশ সুপার পাপোরি চেতিয়া জানান, গৌরীসাগরে পৌঁছনোর পর ঘনকান্ত শৌচকর্মের জন্য গাড়ি থেকে নামতে চান। গাড়ি থেকে নামার পর তিনি তদন্তকারী আধিকারিকের সার্ভিস পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পুলিশ সুপারের আরও দাবি, ওই সময় এক পুলিশকর্মী তাঁর ঊর্ধ্বতন আধিকারিককে বাঁচাতে নিজের সার্ভিস পিস্তল থেকে গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ হন ঘনকান্ত। তাঁকে শিবসাগর সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় এক পুলিশ আধিকারিকও আহত হয়েছেন। তদন্তকারী আধিকারিক সাব-ইনস্পেক্টর দেবাশিস শর্মার ডান পায়ে আঘাত লেগেছে। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছেন। বুধবার সকালে ঘনকান্তের মৃত্যুর খবর পেয়ে সংবাদ সংস্থা ANI-কে অঙ্কিতা ভরালি জানান, তাঁর বাবা, পিসি, ভাই এবং বৌদিকে বিনা কারণে খুন করেছিলেন অভিযুক্ত। এদিন তাঁরও একই পরিণতি হয়েছে বলে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে তাঁদের পরিবার।
অঙ্কিতার কথায়, “আজ সকালে আমরা খবর পেয়েছি, যে অপরাধী আমার বাবা, পিসি, ভাই এবং বৌদিকে খুন করেছিল, তারও একই পরিণতি হয়েছে। এত বড় শোকের মধ্যেও এই খবরে কিছুটা শান্তি পেয়েছি আমরা। আমাদের বাড়িতে প্রিয়জনদের স্মরণে জ্বালানো প্রদীপ নেভার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে যখনই তাকে দেখতাম, তখনই কষ্ট হত। কারণ, কোনও বড় কারণ ছাড়াই সে আমাদের পরিবারের সদস্যদের খুন করেছিল।” এই কঠিন সময়ে পাশে থাকার জন্য অসমের সাধারণ মানুষ, সংবাদমাধ্যম, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং পুলিশকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন অঙ্কিতা। তাঁর দাবি, পুলিশ দিনরাত পরিশ্রম করে তদন্ত চালিয়েছে। তবে এই খুনের পিছনে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
অঙ্কিতা বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী এবং সমস্ত পুলিশকর্মীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এই ঘটনার তদন্ত এখনও অনেকটাই বাকি। অভিযুক্তের পিছনে যদি অন্য কেউ থাকে, কেউ যদি তাকে খুন করতে উৎসাহ দিয়ে থাকে বা মদত জুগিয়ে থাকে, তাহলে তাদেরও খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। এনকাউন্টার যে কারণেই হয়ে থাকুক না কেন, অন্য কোনও অপরাধের মামলার জন্য হোক বা অন্য কোনও কারণে, আমরা আজ ন্যায়বিচার পেয়েছি বলে মনে করছি। তবে এই খুনের ঘটনায় এবং অভিযুক্তদের অন্য অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।”
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর গুয়াহাটি পুলিশের হেফাজতে সাত দিনের রিমান্ড শেষ হয় ঘনকান্তের। ২ নভেম্বর হোটেলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের পর তাঁকে কামরূপ (মেট্রো) মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পেশ করা হয়। পুলিশ আরও হেফাজতের আবেদন জানালেও আদালত তা খারিজ করে দেয়। এরপর তাঁকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। পরে গাড়ির ঋণ সংক্রান্ত জালিয়াতির পুরনো মামলায় ট্রানজিট ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয় শিবসাগর পুলিশ।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২৭ অক্টোবর গুয়াহাটির আদালতে প্রথমবার পেশ করার সময় ঘনকান্তের আইনজীবী পুলিশের এনকাউন্টারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, গুয়াহাটি পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে তাঁকে। পাশাপাশি রাতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালতের এই বিশেষ নিরাপত্তার নির্দেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল নিহতদের পরিবার। এর আগে অঙ্কিতা ভরালি অভিযুক্তকে ‘রাজার মতো’ নিরাপত্তা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেছিলেন। এমনকী অভিযুক্তের এনকাউন্টার অথবা মৃত্যুদণ্ডের দাবিও জানিয়েছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ অক্টোবর রাতে গুয়াহাটির হোটেল বিলাস ইন-এ গুলিবিদ্ধ হয়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। মৃতেরা হলেন হোটেলের মালিক হেলেনা ভরালি (৫৮), তাঁর দাদা ভূদেব ভরালি (৬৫), ছেলে দেবর্ষি কাশ্যপ (৩৯), পুত্রবধূ রিনিকা কাশ্যপ (৩০) এবং পরিবারের পরিচিত নারায়ণ দাস (৪৮)। এই ঘটনায় পরিবারের গাড়িচালক সত্যেন্দ্র পাঠকও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই ঘনকান্ত গগৈকে গ্রেফতার করে গুয়াহাটি পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত .৩২ বোরের পিস্তল উদ্ধার হয়। প্রাথমিক তদন্তে হোটেলের লিজ এবং ভাড়া সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই এই গুলিকাণ্ড বলে জানা গিয়েছিল।