স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : শাসক দলের তকমা যেতেই তৃণমূলের অন্দরে নিশুতির ডাক দিন দিন বাড়ছে। সেই তালিকায় কি নাম লেখালেন কুণাল ঘোষ। কদিন ধরে কেমন যেন বেসুরো শোনাচ্ছে। শপথ নেওয়ার পর থেকেই তিনিও দলের সমালোচনা করতে ছাড়ছেন না। যদিও প্রকাশ্যে বলছেন, তাঁর কথাকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। তবে কি তিনিও দলের ভিতরে অক্সিজেনের অভাব বোধ করছেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে তাপস রায়, সজল ঘোষের অতীত নিয়ে তিনি বড়ই ব্যথিত। এর আগেও দলের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্যের কারণে তাঁর মুখপাত্রের পদও গিয়েছিল।

কিন্তু তখন তো প্রেক্ষাপট আলাদা ছিল। তাই কি পরিস্থিতি বদলাতেই আর রাখঢাক না করেই ঝোড়ো ব্যটিং চালাতে চাইছেন কুণাল ঘোষ। তবে এবার তিনিও পথের বাঁকে এসে নতুন পথ খুঁজছেন।
সোশ্যাল মাধ্যমে তিনি বড়়ই অ্যাকটিভ। তাঁর জেলযাত্রা থেকে ফের রাজনীতির ইতিবৃত্তে ফিরে আসা কোনটাই গোপন নেই। তাঁর দীর্ঘ লড়াইকে অতি বড় সমালোচকও প্রসংশা করবেন। মনে আছে তাঁর সেই জেলযাত্রার সেই দুর্বিসহ দিনগুলি। তাঁর মুখ কীভাবে বন্ধ করা হত সেই সময়। দল হারার পর তৃণমূল সুপ্রিমোকে শুনতে হচ্ছে চোর চোর স্লোগান। আর এই স্লোগান, টানাপোড়েন, বলতে না পারার অসহ্য যন্ত্রণা একদিন কুড়ে কুড়ে খেত সাংবাদিক কুণাল ঘোষকে। মনে আছে সেই সবদিন….
তাই হয়তো তৃণমূল সুপ্রিমোর হারার যন্ত্রণা কেউ বুঝুক ছাই না বুঝক কুণাল ঘোষ বেশ ভালো ভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন। তাই কি কবিগুরুর জন্মদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এইভাবেই যন্ত্রণায় সেঁক দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু সেই কুণাল ঘোষই কেমন যেন সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকেন। শপথ নেওয়ার আগেই হঠাৎ বিধানসভায় ঢুঁ মারতে দেখা গেল তাঁকে। যদিও তিনি পরিস্কার করে দেন গেস্ট কার্ড নিতে এসেছিলেন অন্য কোনও খোঁজে নয়।
আবার শপথ নেওয়ার পর ফেসবুকে দলের একাংশের বিরুদ্ধে পোস্ট করে বোমা ফাটালেন। তাপস রায় এবং সজল ঘোষের প্রাণখোলা প্রশংসা করেন কুণাল৷ সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে লেখেন, ‘তাপস দা, সজল ঘোষদের বাধ্য করা হয়েছিল দল ছাড়তে৷ বৃহস্পতিবার বেলেঘাটা কেন্দ্রের বিধায়ক হিসাবে শপথ নেন কুণাল ঘোষ৷ তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান বিধানসভার প্রোটেম স্পিকার তাপস রায় ৷ বিধায়ক হিসাবে শপথ নেওয়ার পরে করা পোস্টের শুরুতেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানান কুণাল৷ কিন্তু, তার পরেই লেখেন, ‘দীর্ঘদিনের দাদা এবং নেতা৷ তাপসদাকে তৃণমূলে রাখতে আমরা চেষ্টা করেছিলাম৷ পারিনি, দুর্ভাগ্য ৷ পরে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি তাপসদাকে ভাল বলায় আমাকে দল সাসপেন্ড করেছিল৷ ওই পোস্টেই সজল ঘোষ নিয়েও একাধিক ভাল কথা লেখেন কুণালবাবু ৷ তিনি লেখেন, উত্তর ও মধ্য কলকাতায় তাপসদা, সজল ঘোষদের বাধ্য করা হয়েছিল দল ছাড়তে৷ দু’জনকেই রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম৷ আজ তারা বিধায়ক৷ বিচক্ষণতাই কুণাল ঘোষের জুরি মেলা ভার। তিনি ভালো ভাবেই জানেন তাঁর কথা নিয়ে কাটাছেঁড়াতো হবেই। তাই উপসংহার হিসাবে তিনি সকলকে বার্তা দিয়ে বলেন.. তিনি তৃণমূলের সৈনিকই আছেন ৷ লড়াই চলবে৷ আর এটাই কুণাল ঘোষ জল্পনায় জল ঢালতে তার জুরি মেলা ভার। হবে নাই বা কেন তাঁর লড়াই পথ যে কাঁটা বিছানো ছিল। আর কাঁটা উৎপাটন করতে করতে আজ তিনি বিধায়ক। তাঁর নিন্দুকদের কথায় কুণাল ঘোষ ঠিক প্যাঁকাল মাছের মতোই, বড্ড পিচ্ছিল। তাই কি শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়েও প্রশংসা করতে তাঁর মুখে আটকায় না।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে বা মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে অতীতে কম সমালোচনা করেননি কুণাল ঘোষ। বঙ্গ রাজনীতিতে কুণাল ঘোষ ও শুভেন্দু অধিকারীর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। ২০২৩ কুণাল ঘোষ বলেছিলেন, শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর কোনও ব্য়ক্তিগত বন্ধুত্বও নেই, ব্য়ক্তিগত শত্রুতাও নেই। উল্টে তিনি নেত্রী, দলকে আক্রমণ করে বলে, শুভেন্দু অধিকারীকে পাল্টা আক্রমণ করেন তিনি। সেই কারণে শুভেন্দু অধিকারীও তাঁকে আক্রমণ করে। তাঁর কাজ তিনি করে যাবেন। এখানেই শেষ নয় অতীতে কুণাল ঘোষ একাধিকবার অভিযোগ করেছেন যে এসএসসির গ্রুপ সি-তে নিয়োগ দুর্নীতির সাথে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং জেলে যাওয়ার ভয়েই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এখন প্রেক্ষপট বদলেছে। বিরোধী দলনেতা থেকে শুভেন্দু অধিকারী এখন মুখ্যমন্ত্রী। তাই কুণাল ঘোষ কি সমীহ করতে কিংবা সৌজন্যের রাজনীতির কারণে এত মধুর সুরে প্রসংসা করলেন। নাকি ব্যক্তি শুভেন্দু নয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর প্রসংশা করলেন। যদিও অনেকেই বলছেন কুণাল ঘোষ বিচক্ষণ মানুষ তিনি জানেন কীভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়। কখনও বিতর্কিত পোস্ট তো কখনও শুভেন্দু সরকারের প্রংশসা করে কি জল মাপছেন কুণাল ঘোষ। এখন দেখার এই জল কোন দিকে এগোয়। আপনারা কী মনে করছেন ?