Corona Virus mutation covid-19 illustration with dark blue brain cell background
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ২০১৯ সালের শেষের দিকে চিনের উহান শহর থেকে শুরু হওয়া একটি রহস্যময় নিউমোনিয়া সদৃশ রোগ বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। সার্স কোভ-২ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী একটি পরিচিত নাম। ছয় বছর পর মানব ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী অধ্যায় হিসাবে পরিগণিত কোভিড – ১৯। ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের কাছে পুরো পৃথিবী থমকে যাওয়ার সেই দিনগুলি ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিলেও, এর রেশ কাটেনি এখনও। ২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসী যখন এই ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্তান করতে শিখেছে, তখন পিছন ফিরে তাকালে দেখা যায় এক দীর্ঘ সংগ্রাম, উদ্ভাবন, সংগ্রাম ও বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের এক সংমিশ্রণ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ ২০২০ সালে ‘বৈশ্বিক মহামারি’ হিসাবে ঘোষণা করে। মুহূর্তেই পাল্টে যায় পৃথিবীর চেনা রূপ। লকডাউনের কারনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের বড় বড় শহরগুলি জনমানবহীন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব অর্থনীতি সবচেয়ে বড় মন্দার মুখে পড়ে। পর্যটন, বিমান চলাচল এবং সাপ্লাই চেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রিয়জনকে শেষ বিদায় না জানাতে পারার হাহাকার আর হাসপাতালের আইসিইউ-তে অক্সিজেনের জন্য লড়াই ছিল ২০২০ সালের নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য।
মহামারির অন্ধকারে আশার আলো হয়ে আসে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। মাত্র এক বছরের মধ্যে বিজ্ঞানীরা mRNA প্রযুক্তির সাহায্যে টিকা আবিষ্কার করেন, যা আগে অসম্ভব মনে করা হতো। ২০২১ সাল থেকে শুরু হয় ইতিহাসের বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচি। ডেল্টা ও ওমিক্রনের মতো ভ্যারিয়েন্টের ভয়ঙ্কর ঢেউ আছড়ে পড়লেও টিকার কারনে মৃত্যু হার কমতে শুরু করে।
দীর্ঘ তিন বছরের লড়াই শেষে ২০২৩-এর ৫ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯-কে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসাবে ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে। তবে কোভিড -১৯ এখনও পৃথিবী থেকে নির্মুল হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ৭১ লক্ষ ছাডি়য়ে গেছে। যদিও বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৮ থেকে ৩৩ মিলিয়নের মধ্যে হতে পারে। তবে কোভিড এখন আর মহামারি নয়। একটি ঋতুভিত্তিক ফ্লু-তে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রধান মনোযোগের বিষয় হল ‘লং কোভিড’। যারা এই ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়েছেন,তাদের অনেকের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যেটা ভাবাচ্ছে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা JN.1 এবং KP ভ্যারিয়েন্টের মতো নতুন স্ট্রেইনগুলোর বিরুদ্ধে বুস্টার ডোজ তৈরি করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সংক্রমণের হার এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য়ভাবে কমেছে। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কোভিড আক্রান্ত হয়ে পজিটিভিটির রেট ১.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। ওমিক্রমণের পরে নতুন করে কোনও প্রাণঘাতী ভ্যারিয়েন্ট না আসায় জনজীবন এখন স্বাভাবিক।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্ব যে কঠিন সময় পার করেছে, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল। কোটি কোটি মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুও হয়েছে কয়েক লক্ষ মানুষের। কোভিড – ১৯ আমাদের শিখিয়েছে জনস্বাস্থ্য কোনও একটি দেশের একক বিষয় নয়। বরং এটি বৈশ্বিক সংহতির দাবি রাখে। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব এবং মাস্ক ব্যবহারের মতো কঠোর বিধিনিষেধ বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল। তবে কোভিড সংকট থেকে বড় শিক্ষা পেয়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা। দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও ডিজিটাল হেলথ কেয়ারের প্রসার ছিল কোভিড মহামারির অন্যতম ইতিবাচক দিক। তবে কোভিড কেটে গেলেও ‘লং কোভিড’ বা কোভিড পরবর্তী জটিলতা এখনও অনেকের উদ্বেগের কারণ। শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদের মতো উপসর্গগুলি নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘমেয়াদী কোভিডের চিকিৎসার জন্য ক্লিনিকও স্থাপন করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারীতে দাঁড়িয়ে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ অন্তত কোভিডের একটি ডোজের টিকা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে কোভিড-১৯ এর জন্য নির্দিষ্ট অ্য়ান্টি ভাইরাস ওষুধ এবং উন্নত বুস্টার ডোজ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার কারণেই কোভিডে মৃত্যুহার এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড – ১৯ পুরোপুরি নির্মুল না হলেও এটি এখন সাধারণ ফ্লু-র মতোই নিয়ন্ত্রণে। তবে ভবিষ্যতের যেকোন সম্ভাব্য অতিমারি মোকাবিলায় বিশ্ব এখন অনেক বেশি প্রস্তুত। মাস্ক ব্যবহার ও হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি এখন মানুষের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।