শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ইরানে গোপন অস্ত্র সরবরাহের খবর সামনে আসতেই এবার মেজাজ হারালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেজিংকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তেহরানের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিলে চিনকে ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখে পড়তে হবে।

শনিবার মায়ামি যাওয়ার উদ্দেশ্যে হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। সেখানেই তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, চিন গোপনে ইরানকে অস্ত্র পাঠাচ্ছে বলে যে খবর রটেছে, সে বিষয়ে তাঁর অবস্থান কী? স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই ট্রাম্পের উত্তর, দেখুন, চিন যদি সত্যিই এমনটা করে, তবে ওদের কপালে বড় দুঃখ আছে। চিন খুব বড় সমস্যায় পড়তে চলেছে, এটা নিশ্চিত ভাবে জেনে রাখুন।
বিভিন্ন সূত্রে খবর, এই চালানের উৎস লুকোতে বেজিং সরাসরি নয়, বরং তৃতীয় কোনও দেশের মাধ্যমে এই অস্ত্র পাঠানোর ছক কষেছে। বিশেষ করে কাঁধে রেখে ছোড়া যায় এমন বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বা ম্যানপ্যাড পাঠানোর তোড়জোড় চালাচ্ছে জিনপিং প্রশাসন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইলেও বেজিংয়ের এই পদক্ষেপ সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। তাঁর কথায়, চিন যদি মার্কিন স্বার্থে আঘাত লাগে এমন ভাবে ইরানের পাশে দাঁড়ায়, তবে সেটা চিনেরই দায়বদ্ধতা যে তারা কীভাবে সেই জট খুলবে। উল্লেখ্য, আগামী মাসেই ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি চিন সত্যিই ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তাহলে এই সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে এবং তা সরাসরি মার্কিন-চিন সম্পর্কেও প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে—এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সামরিক ইস্যু যুক্ত হলে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। উল্লেখ্য, দিন কয়েক আগেই ইরানের সঙ্গে অস্ত্রবাণিজ্য করা নিয়ে রাষ্ট্রগুলিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি ছিল, আমেরিকা অস্ত্র বেচলেই সেই দেশের উপর বসবে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং আমেরিকান দূতাবাসে বন্দি সংকটের পর থেকেই আমেরিকা ও ইরান একে অপরের ঘোর শত্রু। দীর্ঘ কয়েক দশকের এই বৈরিতা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয় গত কয়েক বছরে। ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেমানির মৃত্যু থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিন হামলা – সংঘাতের পারদ ক্রমে চড়েছে।
পরিস্থিতি সবথেকে ভয়াবহ আকার নেয় ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হানায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনির মৃত্যুর পর সমগ্র আরব দুনিয়া কার্যত বারুদের স্তূপ হয়ে দাঁড়ায়। যার জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
চিন যদিও আগেই ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের কথা অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনে চিনের দূতাবাস থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, এই সংঘাতে কোনও পক্ষকে অস্ত্র জোগানো হয়নি। আমেরিকার এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা উচিত নয়, উত্তেজনা সৃষ্টি করা উচিত নয় বলেও জানায় বেজিং।
এখনও পর্যন্ত ইরানের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। সেই আবহে চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হয়েছে তেহরানের। চিন এবং রাশিয়া তাদের অর্থনৈতিক ভাবেও সহযোগিতা করছে। বিভিন্ন সূত্রে খবর ইরানকে সামরিক সাহায্য়ও জোগাচ্ছে চিন। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার প্রযুক্তি MANPADS সরবরাহ করতে চলেছে তারা। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ আবার দাবি করছেন যে, ইতিমধ্যেই ওই প্রযুক্তি পৌঁছে গিয়েছে ইরানের হাতে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের আক্রমণ ঠেকাতে ওই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে তেহরান। ইরানের তরফে স্পষ্ট ভাবে কিছু জানানো হয়নি এ নিয়ে। তবে আমেরিকার যুদ্ধবিমান নামানোর পর নতুন, অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল তারা।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার শান্তি-আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান থেকে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সদের। তবে ইরানের জন্য সেরা প্রস্তাব’টি তাঁরা রেখে এসেছেন। বৈঠক শেষে এমনটাই জানিয়েছেন ভান্স। ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আমেরিকার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভান্স। রবিবার ভান্স একটি বিবৃতি দিয়ে দুঃসংবাদ দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে তাঁদের কোনও সমঝোতা হয়নি। কারণ, ইরান তাঁদের শর্ত মানতে চায়নি।
এদিকে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান সহযোগিতা করুক বা না করুক, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবার খুলে দেওয়া হবে। বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার পর এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে বড় গুরুত্ব পাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, খুব দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে কাজটি সহজ নয়। তাঁর মতে, একাধিক মিত্র দেশ ইতিমধ্যেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এই প্রণালী শুধু একটি দেশের নয়, বহু দেশের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।