মাইকের একটি ঘোষণা, আতঙ্কিত জনতা আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাওয়া পরিস্থিতি। চোরবাগান পুজোর সেই ভয়াবহ সন্ধ্যার ঘটনা এখনও বহু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সপ্তমীর রাতে মণ্ডপে হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ জন। আর সেই ঘটনার তদন্তের মধ্যেই সামনে এল নতুন তথ্য।

মাইকে মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে বলে ঘোষণা করার অভিযোগে চিহ্নিত দুই ব্যক্তির মধ্যে দ্বিতীয় জন কুশল মজুমদারও পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর গ্রেফতারির পরেই আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিনি যখন পুলিশের হেফাজতে, তখন তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কীভাবে একের পর এক পোস্ট প্রকাশিত হল? সেই পোস্টে হাতে লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে নিজের ভূমিকা নিয়ে কী দাবি করেছেন কুশল? কেন তিনি মাইকে ঘোষণা করেছিলেন? আর এই বক্তব্য কি চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্তে নতুন কোনও দিক খুলে দিতে পারে? একে একে জেনে নেওয়া যাক গোটা ঘটনাটি।
প্রথমেই আসা যাক গ্রেফতারির প্রসঙ্গে। চোরবাগান পুজোর সপ্তমীর সন্ধ্যায় মাইকে ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন সঞ্জীব রাহা, যিনি সেন্টু নামেও পরিচিত। দ্বিতীয় জন কুশল মজুমদার, যিনি চোরবাগান পুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত বলে দাবি করেছেন। সূত্রের খবর, শুক্রবার সকালে কুশল হেয়ার স্ট্রিট থানায় আত্মসমর্পণ করতে যান ও পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর ঠিক কী ভূমিকা ছিল, মাইকে ঘোষণার সিদ্ধান্ত কী পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়েছিল ও সেই ঘোষণার ফলে ভিড়ের পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব পড়েছিল। এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঠিক কী ঘটেছিল? চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে তখন দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় ছিল। এরই মধ্যে মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মাইকে মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে বলে ঘোষণা শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই ঘোষণা শোনার পর দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায় ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ভিড়ের চাপে অনেকে সমস্যায় পড়েন। এই ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানির খবর সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কী কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠল? মাইকে ঠিক কী ঘোষণা করা হয়েছিল? কে সেই ঘোষণা করেছিলেন ও সেই সময়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? তদন্তকারীরা এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখছেন।
এবার আসা যাক কুশল মজুমদারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত চিঠির কথায়। ওই হাতে লেখা নোটে কুশল দাবি করেছেন, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে চোরবাগানের পুজোর সঙ্গে যুক্ত। ঘটনার জন্য ক্লাবের সকল সদস্যের হয়ে তিনি দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর নিজের বক্তব্যে তিনি সপ্তমীর সন্ধ্যার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। কুশলের দাবি, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্লাবে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় গিরিশ পার্ক থানার বড়বাবু ও ছোটবাবুও সেখানে ছিলেন। তাঁরা চা খেতে চাইলে কুশল ও ক্লাবের আর এক সদস্য চা আনতে যান বলে তাঁর বক্তব্য। চা দেওয়ার পর তাঁরা ক্লাবঘরে কিছু কাজ করছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর একটি শব্দ শুনতে পান বলে দাবি করেছেন কুশল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই শব্দ শোনার পর দুই পুলিশ আধিকারিক ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যান।
কুশলের চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, এর পর ক্লাবের সম্পাদকের ছেলে কবির এসে তাঁকে জানান, মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। সেই সময় কুশল বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য। তখন এক পুলিশকর্মী তাঁদের মাইকে ঘোষণা করতে বলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। কুশলের কথায়, সামনে গিয়ে তিনি দেখেন, যিনি আগে মাইকে ঘোষণা করছিলেন, তিনি সেখানে নেই। ফলে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে মাইকে ঘোষণা করতে হয়। তাই তদন্তে এই বক্তব্যের সঙ্গে অন্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নথির মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
চিঠিতে মাইকের অবস্থান নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন কুশল। তাঁর দাবি, মাইকের মুখ মণ্ডপের ভিতরে বা মাঠের দিকে ছিল না। বরং সেটি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট, অমর বসু সরণি ও পার্বতী ঘোষ লেনের দিকের দিকে ছিল। মণ্ডপের সামনে থাকা একটি ছোট লাল মাইকে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গান বাজানো হচ্ছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁর এই ব্যাখ্যা ও ঘটনাস্থলে ঠিক কীভাবে ঘোষণা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। কারণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাইকে ঘোষণার পর দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। ফলে শুধু কী বলা হয়েছিল, তা নয় কোন পরিস্থিতিতে বলা হয়েছিল ও তার ফলে ভিড়ের আচরণে কী প্রভাব পড়েছিল, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এদিকে কুশল গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে চিঠি পোস্ট হওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে হাতে লেখা ওই চিঠি প্রকাশিত হয়। অথচ সেই সময় কুশল থানায় আত্মসমর্পণ করতে গিয়েছিলেন বলে খবর। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, পোস্টটি কি তিনি নিজে করেছিলেন, নাকি তাঁর কোনও পরিচিত বা আত্মীয় তাঁর হয়ে সেটি প্রকাশ করেছেন? পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, গ্রেফতারির পর কুশলের নিজের হাতে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করার সুযোগ ছিল না। তবে কে পোস্টটি করেছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তাঁর ফেসবুক লাইভ প্রকাশিত হওয়া ও পরে সেটি মুছে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এই ঘটনাগুলির পেছনে ঠিক কী রয়েছে, তা স্পষ্ট করতে আরও তথ্যের প্রয়োজন।
কুশলের স্ত্রী কোয়েল মজুমদারের বক্তব্যও এই ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তিনি দাবি করেছেন, বিপদে পড়া মানুষদের সাহায্য করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তাঁর স্বামী, তারপর আর বাড়ি ফেরেননি। তাঁর আরও বক্তব্য, কুশল তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি থানায় যেতে চান, কিন্তু কেউ তাঁকে ২৭ তারিখের আগে থানায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। সেই কেউ কে, কেন তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল ও এই কথার সঙ্গে তদন্তের কোনও যোগ রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্তে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট কাজ করছে। পাশাপাশি লালবাজারের পুলিশও ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। মাইকে ঘোষণা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, মণ্ডপের নিরাপত্তা ও ঘটনার আগে-পরে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, এই সব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা জরুরি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়ো নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার।