আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি চতুর্থ সপ্তাহে পড়ছে। যার প্রভাব পড়েছে ভারতেও। গ্যাসের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে তেল ও গ্যাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও তার মধ্যে ভারতের একাধিক তেলবাহী জাহাজ ইরানের ছাড়পত্র পেয়েছে। তারপরেও দেশের অভ্যন্তরে কতটা জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে? এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সঙ্কট পর্যালোচনা বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সহ প্রমুখ। বৈঠকের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূলত, পেট্রোলিয়াম, অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠকটি হয়েছে। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সাফ-বার্তা যুদ্ধের আঁচ যেন সাধারণ মানুষের উপরে না পড়ে। তাদের রক্ষা করতে হবে।

সরকারি সূত্রে খবর, ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠকে যুদ্ধ ও সঙ্কট নিয়ে স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী-দুই উপায় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। যাতে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় থাকে। পাশাপাশি শক্তি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ কয়লা মজুত রাখা হবে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলিতে। যাতে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি বা সঙ্কট দেখা না দেয়। এছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল, কেমিক্যাল, ওষুধ ও অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সারের সরবরাহও বজায় রাখতে বলা হয়েছে, যাতে খাদ্য সঙ্কট দেখা না দেয়। ভবিষ্যতে বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করা হয়।
এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বৈঠক নিয়ে লিখেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠক করলাম। আমরা স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছি। কৃষকদের জন্য সারের জোগান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে একাধিক আমদানির পথ তৈরি, রফতানির জন্য নতুন জায়গা খুঁজে নেওয়া সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা যুদ্ধের প্রভাব থেকে নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জানা গিয়েছে, মূলত দেশের জ্বালানি সরবরাহ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে স্বাভাবিক থাকে এবং দেশজুড়ে বন্টন প্রক্রিয়া যাতে সুষ্ঠুভাবে চালু থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। বৈঠকে মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য যেকোনও বিঘ্ন মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার তা বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে PIB। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশজুড়ে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে। আতঙ্কের বুকিংয়ের প্রবণতাও কমেছে।
সরকার জানিয়েছে, রাজ্যগুলিতে বাণিজ্যিক এলপিজি-র সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলির জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে, রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পিএনজি সংযোগ বাড়ানোর জন্য। যাতে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক, দু ক্ষেত্রেই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটে।
গ্যাস মজুত করে রাখা বা কালোবাজারি রুখতে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
দেশের সব বড় বন্দরগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্ম চলছে এবং কোথাও কোনও সমস্যা নেই বলে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে কেন্দ্র। সেই সঙ্গে, ওই অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইরান, ইজরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মোদী এই পরিস্থিতিকে ধৈর্য ও সচেতনতার সঙ্গে মোকাবিলার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন ঘটেছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরানের উপর হামলার পর এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
পাল্টা জবাবে ইরান ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে হামলা চালায়। এই পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত, জর্ডন, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, ইজরায়েল ও ইরানের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
৪৮ ঘন্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না করলে ইরানকে ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টা জবাবে তেহরান জাননায় হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ নয়। বিদেশি জাহাজগুলো এখনও এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারে তবে, ইজরায়েল, আমেরিকা এবং তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর জন্য ওই সমুদ্রপথ বন্ধ। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা বা আইএমও-র কাছে ইরানের প্রতিনিধি আলি মুসাভি বলেছেন, বিদেশি জাহাজগুলো এখনও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারে। তবে শর্ত হল, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে তাদের তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে হবে। ব্রিটেনে নিযুক্ত ইরানের দূত হিসেবে বক্তব্য রাখার সময় মুসাভি জোর দিয়ে বলেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও বজায় রাখতে হবে।পাশাপাশি, এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইরান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।