Flames and smoke rise form an Israeli airstrike on Dahiyeh, in the southern suburb of Beirut, Lebanon, Sunday, Oct. 20, 2024. (AP Photo/Hussein Malla)
শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হল? যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে কি ধোঁয়াশায় দুই দেশ ? দু দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ কি বলছে ?আদৌ কি ২ সপ্তাহ যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে পারবে দু দেশ ? ইজরায়েলকে কি হাতিয়ার করে লেবালনে হামলা ? হরমুজ প্রণালী নিয়ে ফের কোনও নয়া সিদ্ধান্তের পথে ইরান ?

দু সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে। আমেরিকা ও ইরান । শক্তি ও দম্ভের সংঘাতের জয়ের মুখ দেখবে কোন দেশ ? এটা বলা সত্যিই ভীষণ কঠিন । এরই মাঝে লেবাননে হামলা চালিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে ইজরায়েল। ক্যানসারের সঙ্গে তুলনা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদি পোস্টও করা হয় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের তরফে। এই বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় নেতানিয়াহু সরকারের তরফে। এরপরই পোস্টটি মুছে দেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায় যুদ্ধবিরতির সময়ই কেন লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজ়বুল্লার ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাল ইজরায়েল। হোয়াইট হাউসের তরফে যদিও দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যে লেবাননের নাম নথিভুক্ত নেই। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি প্রকাশের পর নাকি উত্তেজনা সাময়িক কমেছে পশ্চিম এশিয়ায়। তবে একটা দিনও ঠিক করে কাটতে পারল না। যুদ্ধিবিরতির শর্ত নিয়ে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে সরগরম যুযুধান দুই শিবির। তবে একটা বিষয় লক্ষ করে দেখেছেন কী কারণে, কোন শর্তে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হল সবপক্ষ, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
আমেরিকা-ইজরায়েল জোট হোক কিংবা ইরান—সকলেই নিজের মতো তত্ত্ব সামনে আনছে। চলুন তাদের যুক্তিগুলি একটু স্পষ্ট করি আপনাদের সামনে। ট্রাম্পের দাবি, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া ও তেজষ্ক্রিয় ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের শর্তেই হামলা বন্ধ রেখেছে আমেরিকা। ইরানের দাবি আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জানিয়েছে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ, তাতে টোল বসানোর অধিকার তাদের হাতেই থাকবে। ইউরেনিয়াম নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাবে তারা। এই শর্তেই চুক্তিতে রাজি হয়েছে তেহরান। এরই মাঝে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লেবাননের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত ইজরায়েল।
একদিকে ইরানের উপর চাপ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, চুক্তির সমস্ত শর্ত যতক্ষণ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ ও সেনা ইরানকে চারপাশে থেকে ঘিরে রাখবে। অন্যদিকে কোনওভাবেই দমতে রাজি নয় ইরান। সেদেশের সংবাদমাধ্যমে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকায় উল্লেখ রয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে প্রচুর সি-মাইন পেতে রেখেছে আইআরজিসি। হরমুজের মানচিত্র প্রকাশ করে তার উপর বেশ কয়েকটি স্থানে ফার্সি ভাষায় ডেনজার জোন। হরমুজ প্রণালী থেকে পারস্য উপসাগরের মুখ পর্যন্ত বিছানো রয়েছে মাইনগুলি। এই সমুদ্র পথ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণ হয়। যদিও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর সেই বিস্ফোরকগুলি তারা নিষ্ক্রিয় করেছে কি না, সেব্যাপারে কিছুই জানায়নি ইরান।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ। যুদ্ধবিরতির পর সীমিত পরিসরে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা করেছে ইরান। তবে ইরান জানিয়েছে,এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে হলে প্রতিটি জাহাজকে তাদের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। এরই মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর নজরদারি ড্রোন এমকিউ–৪সি হরমুজ প্রণালীর উপর নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ড্রোনটি উড়ন্ত অবস্থায় জরুরি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল। এটি বিধ্বস্ত হয়েছে, নাকি ভূপাতিত করা হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এমকিউ-৪সি ট্রাইটন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দামি ড্রোন বিমানগুলোর একটি, যার মূল্য ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এই ঘটনা নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
সব শেষে দুটো তথ্য আপনাদের দেব। যার থেকে আপনারাই বিচার করতে পারবেন যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বেশকিছু বিষয়। আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার জবাবে তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অন্তত ১২টি মার্কিন সেনা ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর ঘাঁটিগুলো এখন প্রায় ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হয়ে পড়েছে। বাহরিন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কুয়েত, কাতার ও ওমান—এই ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলি। পাশাপাশি বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ৯ হাজার সেনার এই ঘাঁটি এখন এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেখানে নৌবহরকে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল, তা এখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর এই কারনেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। এই কারণেই ওয়াশিংটন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেয়। ইরানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি করাতে চাপ দেয়।

আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ছিল না। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়াচ্ছিলেন এবং দাবি করছিলেন, তেহরান নাকি ‘যুদ্ধবিরতির জন্য প্রার্থনা করছে’। কিন্তু পর্দার আড়ালের হোয়াইট হাউসই সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন নাকি পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যাতে তারা ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়। টাম্পের ধারনা অনুযায়ী, পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ এবং প্রতিবেশী হওয়ার কারণে তাদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে।
এদিকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা সামরিক সংঘাতের পর, উভয় পক্ষই নিজেদের জয়ী দাবি করছে। মার্কিন প্রশাসন “পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়” ঘোষণা করেছে। তাদের দাবি, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোজতবা খামেনেই বলেছেন এই যুদ্ধে ইরানের জনগণই বিজয়ী পক্ষ। কারণ তারা মার্কিন চাপের মুখে টিকে থাকতে পেরেছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বিশ্ববাজারে তেল সংকট তৈরি করেছে। তবে যুদ্ধে জয়যুক্ত হওয়ার চেয়ে যুদ্ববিরতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কে জয়ী হয় সেটাই এখন দেখার।