সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। প্রতীকও ককরোচ অর্থাৎ আরশোলা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর রাজনৈতিক কটাক্ষে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাদের এক্স হ্যান্ডল পেজটি। কিন্তু আচমকাই ভারতে তাদের এক্স হ্যান্ডেল ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতার অভিযোগ, এটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত। এবার সেই বিতর্ক গড়াল দিল্লি হাই কোর্টে। কিন্তু আদালত কি সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি দিল? কী বলল কেন্দ্র? আর কেন এত আলোচনায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?

দিল্লি হাই কোর্টে শুক্রবার শুনানি হয় ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের আবেদনের। অভিজিৎ দিপকের দাবি, কোনও পূর্ব নোটিস ছাড়াই দলের এক্স হ্যান্ডেল ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে হাজার হাজার সমর্থক এবং অনুসারীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তিনি আদালতের কাছে আর্জি জানান, অবিলম্বে অ্যাকাউন্টটি খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হোক। তবে দিল্লি হাই কোর্ট তাৎক্ষণিক কোনও অন্তর্বর্তী স্বস্তি দিতে রাজি হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য না শুনে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
বিচারপতি পুরুষেন্দ্র কুমার কৌরভ কেন্দ্রকে নোটিস জারি করে জবাব তলব করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ৬ জুলাই। এর পাশাপাশি আদালত জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে গঠিত রিভিউ কমিটির কাছেও আবেদন করতে পারবেন অভিজিৎ দিপকে। বিদেশে থাকলেও তিনি ভার্চুয়ালি শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন বলেও জানিয়েছে আদালত। শুনানিতে অভিজিৎ দিপকের আইনজীবী অখিল সিব্বল দাবি করেন, ককরোচ জনতা পার্টি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। কিছু পোস্ট নিয়ে আপত্তি থাকলে নির্দিষ্ট পোস্ট সরানো যেতে পারে। কিন্তু পুরো অ্যাকাউন্ট ব্লক করা অযৌক্তিক।
তিনি আরও জানান, ব্লক করার যে সরকারি নির্দেশ রয়েছে, তার কপিও এখনও তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তবে আদালত জানায়, সরকারি নথি সামনে না থাকায় এই মুহূর্তে কোনও মন্তব্য করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, এখনই অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার নির্দেশ মানে কার্যত মামলার মূল আবেদন মঞ্জুর করে দেওয়া। তাই কেন্দ্রের বক্তব্য না শুনে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। উল্লেখ্য, গত ২১ মে ককরোচ জনতা পার্টির মূল এক্স হ্যান্ডল ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়।
কিন্তু তারপরেই নতুন নামে ফিরে আসে প্ল্যাটফর্মটি। ‘Cockroach is Back’ নামে নতুন হ্যান্ডল খুলে তারা আবার প্রচার শুরু করে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্টে লক্ষাধিক অনুসারী জুটে যায়। কিন্তু কী এই ককরোচ জনতা পার্টি? গত ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এটি। অভিজিৎ দিপকের দাবি, তরুণ প্রজন্মের সমস্যা তুলে ধরা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই প্ল্যাটফর্মটির লক্ষ্য। সম্প্রতি শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম এবং নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁস বিতর্কে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে প্রচারও শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি।
রাজনৈতিক মহলে আরও একটি বিষয় নিয়ে জোর চর্চা চলছে। অভিজিৎ দিপকে একসময় আম আদমি পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। অনেকের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রচারের পরীক্ষাগার হিসেবেই উঠে আসছে এই উদ্যোগ। তবে সমর্থকদের দাবি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ গণতন্ত্রেরই অংশ। সমালোচকদের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ফলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর জাতীয় নিরাপত্তার সীমারেখা কোথায়? একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মকে ব্লক করা কতটা যুক্তিযুক্ত? আর আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোন দিকে যায়? সেই উত্তর মিলবে আগামী শুনানিতে। ততদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।