ডিজিটাল ডেস্ক : পরিচালক অনীক দত্তের রহস্যমৃত্যু। শেষে কিনা ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু। এখনও রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি টলি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। রাহুলের মৃত্যু রহস্যের জট এখনও অধরা। আর তারমধ্যেই একি দুঃসংবাদ। বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হল অনীক দত্তের। তবে এই মৃত্যু নিয়েও জমাট বেঁধেছে রহস্য। উঠেছে নানা প্রশ্ন। সূ্ত্র মারফত জানা গেছে কিছুদিন ধরে মন ভালো ছিল না অনীক দত্তের। অবসাদে ভুগছিলেন। কিসের অবসাদগ্রাস করেছিল তাঁর মনে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার সময় গাছে ধাক্কা খান। ভেঙে গেছে গাছের ডালও। চাপ চাপ রক্ত পড়ে রাস্তায়। নিছকই দুর্ঘটনা না অন্য কোনও কারণ লুকিয়ে অনীক দত্তের মৃত্যুতে তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

হিন্দুস্তান পার্কের অভিজাত বহুতলে বাস ছিল অনীক দত্তের। বুধবার দুপুরে সেই বহুতলেরই ছ’তলার ছাদ থেকে পড়ে যান তিনি। বহুতলের গা ঘেঁষে থাকা একটি গাছের ডালও ভেঙে যায়। ছাদ থেকে পড়ার সময় অনীক ওই গাছে ধাক্কা খান বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার সময় বাড়িতেই ছিলেন অনীকের স্ত্রী। যে জায়গায় আছড়ে পড়েছিলেন অনীক, সেখানে চাপ চাপ রক্ত পড়ে ছিল। ওই জায়গাটি এনক্লোজ করে দেয় পুলিশ। চক দিয়ে ডিমার্কেশন করা হয়। ওই জায়গা থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকুরির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অনীককে। সেখানেই শেষ। এমনিতেই তাঁর বাম ঘেষা মনোভাবের কারণে ইন্ড্রাস্ট্রিতে কোণঠাসা অবস্থান ছিল তাঁর। ঠোট কাঁটা ছিলেন তাই সোজা কথা সোজাভাবে বলতে ভালো বাসতেন। এমনকি পর্দাতে তাঁর সৃষ্টিতেও ফুটে উঠত সামাজের অবক্ষয় গুলি। এখনও তো অনেক কিছু বলার ছিল। তবে কেন এত তাড়াতাড়ি জীবনের চিত্রনাট্যে ইতি টানলেন অনীক দত্ত। তবে কি তাঁর কাজের উপর যে চাপ তৈরি হচ্ছিল তা তিনি মানতে পারছিলেন না। সেই কারণেই কি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। কাউন্সেলিং চলছিল তাঁর।
ছোটবেলা কেটেছিল গোলপার্ক এবং উত্তরবঙ্গে নিজেদের পারিবারিক টি-এস্টেটে । নিঃসঙ্গ অনীকের সঙ্গী ছিল গল্পের বই, কমিকস। একটু বড় হতে সেই পরিসরে ঢুকে পড়েছিল সিনেমা। দেশ-বিদেশের সিনেমা এবং সত্যজিৎ রায় ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা। প্রথম কর্মজীবনে তাই বিজ্ঞাপন তৈরির জগতেই নাম লিখিয়েছিলেন এই সত্যজিৎ-ভক্ত। চুটিয়ে কাজ করতেন বিজ্ঞাপনের। বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে পরিচালনা,সামলাতেন সবই। নামীদামি হোক কিংবা খুব সাধারণ পণ্যতাঁর কারসাজির গুণে সেইসব পণ্যের বিজ্ঞাপন মনে দাগ কাটত দর্শকের মনে। যেমনটা তাঁর ভূতের ভবিষ্যৎ। মজা-গপ্পের মধ্যে সিরিয়াসনেস মিলমিশে একাকার। সেই গল্পে দর্শককে বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বাঙালিয়ানার মিশেল। যার ফলসসরূপ ভূতের ভবিষ্যৎ হিট। তালিকা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে আশ্চর্য প্রদীপ, মেঘনাদ বধ রহস্য, বরুণবাবুর বন্ধু, অপরাজিত। তাঁর তৈরি ছবি অপরাজিত-কে ঘিরেও বিপুল বিতর্ক হয়েছিল। তাঁর শেষ ছবি যত কাণ্ড কলকাতাতে কেও ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলোচনা। আদ্যোপান্ত বামপন্থী ভাবনার মানুষ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন পরিচালক।
বক্স অফিসের পাশাপাশি সমাজজীবনে ঝড় তুলেছিল অনীক দত্তের প্রথম ছবি। ছবি তৈরির ক্ষেত্রে আপোস করেননি কোনওদিন। সে তদানীন্তন রাজ্য সরকারের চোখরাঙানি হোক কিংবা তৃণমূলের হর্তা-কর্তাদের নির্দেশে প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া নিয়ে গা-জোয়ারি হোক। অগাধ ভরসা ছিল নিজের লেখা চিত্রনাট্যে এবং কাজের উপর। তাই তো তৃণমূল সরকারের তীব্র বিরোধিতা করার পুরস্কার হিসেবে ‘অপরাজিত’ প্রথম দিকে স্রেফ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে বেখাপ্পা প্রদর্শনীর সময় পেলেও ভেঙে পড়েননি। জানতেন, খেলা ঘুরবে। আর ঘুরেও ছিল। সাধারণ সিনেমাপ্রেমী দর্শক থেকে শুরু করে শ্যাম বেনেগাল, তরুণ মজুমদারের মতো ছবি পরিচালকেরা আন্তরিক প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন অনীক এবং তাঁর অপরাজিত-কে। তাই তো টলিপাড়ার বাকি সব নির্মাতাদের থেকে আলাদা, দৃপ্ত কণ্ঠে অনীক দত্ত-ই প্রথমবার বলে উঠেছিলেন, কেন বলব পাশে দাঁড়ান বাংলা সিনেমার? ভিক্ষে করতে নেমেছি নাকি? ভাল ছবি হলে মানুষ দেখবে নইলে ছুড়ে ফেলে দেবে! সিম্পল!
কিন্তু জীবন তো আর সিম্পল নয়। তাইতো খ্যাতি, স্রোতের বিরুদ্ধে ল়ড়াই এইসব নিয়েই জটিল হয়ে উঠেছিল জীবন। স্বাস্থ্যও সঙ্গ দিচ্ছিল না তাঁর। শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। চিকিৎসাও চলছিল। এর মধ্যেই তিনি তাঁর দর্শকদের উপহার দিয়েছিলেন যতকাণ্ড কলকাতায় নামক সিনেমা। আর যাকে নিয়েও আলোচনা কম হয়নি।
মৃত্যুকালে অনীকের বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৬। পাঁচ দিন আগেই জন্মদিন গিয়েছে পরিচালকের। কে জানত এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো..।