সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্য়ায়, সাংবাদিক : নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে তত যেন ফের নতুন করে রাজনৈতিক হিংসার আগুনে উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ইউনুস চাইছেন যে কোন উপায়েই হোক না কেন এই ভোট বৈতরণী পার হতে আবার অন্যদিকে তারেক রহমান তথা বিএনপিও ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় জামাত প্রার্থী মুফতি আমির হামজাকে হত্যার হুমকি কিন্তু যথেষ্ঠ ইঙ্গিতবাচক। কেন তাকে হুমকি দেওয়া হল? কে বা কারা রয়েছে এর আড়ালে? কোন উদ্দেশ্য সাধন করতে এই হুমকি? সম্প্রতি কুষ্টিয়া সদর আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজার একটি বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়, ভিডিওটিতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর নাম বিকৃত করে বক্তব্য দিতে দেখা যায় মুফতিকে। যা নিয়ে তৈরি হয় এক তুমুল বিতর্ক, জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে আমির হামজার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রয়াত একজন ক্রীড়া সংগঠককে নিয়ে আমির হামজার অসৌজন্যমূলক বক্তব্যে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুবুদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুফতি আমির হামজা বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর নাম বিকৃত করে একটি ইতর প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এরূপ অশালীন ও কাণ্ডজ্ঞানহীন ভাষার ব্যবহার কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। তাঁর বক্তব্য উসকানিমূলক ও চক্রান্তমূলক, যা আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত করার শামিল। কিন্তু এই বক্তব্যটি ২০২৩ সালের দাবি করে ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন আমির হামজা।

আর আশ্চর্যজনক ভাবে এই বক্তব্য ভাইরাল হতেই হুমকি গেল মুফতির কাছে? বিএনপির সমর্থকরাই কি? রাজনৈতিক মহল কিন্তু দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলছে। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টে মুফতি আমির হামজা লিখেছেন, ‘একটু জানিয়ে রাখি। গতকাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি মৃত্যুর জন্য সব সময় প্রস্তুত তবে আপনাদের কাছে অনুরোধ রইলো, আমার অনুপস্থিতিতে কুষ্টিয়াতে যেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই আমরা শুরু করেছি, সেটা আপনারা অবশ্যই এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং আমার ৩ শিশু কন্যাসন্তানকে একটু দেখে রাখবেন (হামজা ফেসবুক পোস্ট)। যদিও হামজার বক্তব্য ভাইরাল হতেই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উজাড় করে দেন মহিলারা, হামজার বিরুদ্ধে মহিলারা রীতিমতো ঝাটা হাতে রাস্তায় নামেন। তারা অভিযোগ করেন, একজন ধর্মীয় বক্তার কাছ থেকে এমন কুরুচিপূর্ণ ও অসংবেদনশীল বক্তব্য কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। মৃত একজন মানুষকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য সমাজে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করেন। মুফতি আমির হামজাকে হত্যা হুমকির বিষয়ে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী সুজাউদ্দিন জোয়াদ্দার বলেন, পুরোনো বিষয় নিয়ে যেভাবে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, তিন বছর আগের যে বিষয়ে আমির হামজার বক্তব্য ঘিরে এত কথা হচ্ছে সেটা নিয়ে কিন্তু তখন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। কিন্তু তিন বছর পর নির্বাচনের পরিবেশকে বিঘ্নিত করার জন্য এমন কাজ করা হচ্ছে ইচ্ছেক্রিত ভাবেই। এ ধরনের নোংরা রাজনীতির তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। হত্যার হুমকির বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি। প্রশাসন বলেছে তাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। আর আমরা পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেব। অন্যদিকে মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জে মানহানির মামলা দায়ের করা হয়েছে। জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ভিপি শামীম খান সিরাজগঞ্জ সদর আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপির জন সমর্থন বৃদ্ধি পাওয়ায় কুষ্টিয়া জেলার জামায়াতের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা বিএনপির নেতানেত্রী সম্পর্কে বিভিন্ন সময় অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করে আসছেন। মুফতি আমির হামজা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ডাবিরাভিটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াজ-মাহফিলে ইসলামি বক্তব্য প্রচার করে আসছেন। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী তাকে কুষ্টিয়া-৩ আসনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২১ সালে স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসও করেছেন তিনি। যেভাবে এখন লাগাতার তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাতে করে স্বাভাবিক ভাবেই নিজের নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন তিনি আর তাই এই মুহূর্তে তার যা যা সভা এবং অন্যান্য কর্মসূচী ছিল তার সবটাই স্থগিত করে দেওয়া হয়েছেব অনির্দিষ্ট কালের জন্য। এখন এক বিরাট বড় প্রশ্ন যার উত্তর অধরাই যে এই গোটা ঘটনার আড়ালে মূল দোষী কে বা কারা? প্রাথমিকভাবে বিএনপির দিকে সন্দেহের আঙুল উঠলেও জামাত নিজেই আড়াল থেকে কোন কলকাঠি নারছে? কোন ভাবে জামাতের অন্দরমহলে কোন অংশের কাছে হামজা কি কাঁটা হয়ে উঠেছিলেন? জামাতের কার্যকলাপে কোনভাবে বাধা হয়ে উঠছিলেন হামজা? আর তাই কি একেবারে উদ্দেশয়প্রণোদিত ভাবে তার পুরনো বক্তব্যকে ভাইরাল করে দেওয়া হল ঠিক নির্বাচনী আবহে? বিএনপির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে ভোটের পুরো ফায়দা যাতে তুলতে পারে জামাত? কারণ এটা একেবারে স্পষ্ট যে জামাত পারে না এমন কোন কাজই নেই। আবার এই ঘটনাকে সামনে নিয়ে এগোতে চাইবে বিএনপিও। বাংলাদেশে ভোটের মুখে দিনকয়েক আগেই সংঘর্ষে জড়িয়েছিল দুই যুযুধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামাত এবং বিএনপি বিএনপি-র অভিযোগ, জামাতকে ভোট দিলে স্বরগ পাওয়া যাবে’— এই মর্মে ভোটের প্রচার চালাচ্ছিলেন জামাতের নেতারা। তা নিয়ে বিএনপি-র নেতা-কর্মীরা আপত্তি তোলায় দু’পক্ষের প্রথমে বচসা বাধে। পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। যদিও জামাতের দাবি, রায়চাঁদবাজার এলাকায় জামাতের মহিলা কর্মীদের একটি বৈঠক ছিল। সেই বৈঠক সেরে ফেরার পথে জামাতের এক নেত্রীকে হেনস্তা করেছেন বিএনপি-র এক কর্মী। তাঁকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজও করা হয়েছে। পরে ওই নেত্রীর স্বামী প্রতিবাদ করতে গেলে বচসা বাধে। তাঁকে মারধরও করা হয়। এবার যখন জামাতের এক নেতা এভাবে প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন তখন সেটার ফায়দা কে কতটা তুলতে পারে তা নিয়ে একটা প্রেস্টিজ ফাইট তো চলবেই। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য বাংলাদেশের শেষ পর্যন্ত ভেঙেই গিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোট। দফায় দফায় আলোচনা শেষে দশটি দলের আসন সংখ্যা ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান। ৩০০ আসনের মধ্যে জামাতি ইসলামি একাই লড়াই করবে ১৭৯ আসনে। তাৎপর্যপূর্ণ হলো এই জোটেই নাম লিখিয়েছে নবীন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি। যারা ২০২৪ এ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে। এত বড় কৃতিত্বের পরেও তাদের ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ৩০ টি আসুন। এছাড়া জামাতের জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিভারের ডেমোক্রেটিক পার্টির সাতটি, আমার বাংলাদেশ পার্টির তিনটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও নিজামে ইসলাম পার্টি দুটি করে আসনে প্রার্থী দেবে। ফলে প্রতিমুহুরতে বদলাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ এবার দেখার বিষয় একটাই মুফতি আমির হামজার এই ঘটনা কাকে বেশি এডভান্টেজ দেয়।