ভারতীয় রেলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বুলেট ট্রেন তৈরির কাজ এগোচ্ছে দ্রুত গতিতে। মুম্বই-আমেদাবাদ হাইস্পিড রেল করিডরের জন্য এই ট্রেন তৈরি হচ্ছে কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে ভারত আর্থ মুভার্স লিমিটেড (BEML)-এর কারখানায়। দেশীয় প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিশ্বমানের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হচ্ছে এই ট্রেন।

রেল মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ভারতের আবহাওয়া ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে এই বুলেট ট্রেনের নকশা তৈরি করা হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধা, সহজে ওঠানামা এবং ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাইস্পিড রেল প্রযুক্তিতে দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
এই বুলেট ট্রেনের সর্বোচ্চ পরীক্ষামূলক গতি হবে ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার। তবে বাণিজ্যিকভাবে চলার সময় এর গতি থাকবে ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার। ট্রেনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০২ মিটার। মোট আটটি কামরা থাকবে এই ট্রেনে। এর মধ্যে চারটি মোটর কোচ এবং চারটি ট্রেলার কোচ। একসঙ্গে মোট ৫৫৭ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি এবং চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে এমন যাত্রীদের জন্য থাকবে দুটি নির্দিষ্ট জায়গা।
ট্রেনে সাতটি সাধারণ শ্রেণির কামরা থাকবে, যেখানে ৩×২ আসন বিন্যাস থাকবে। পাশাপাশি একটি এক্সিকিউটিভ শ্রেণির কামরায় থাকবে ২×২ আসন বিন্যাস। ট্রেনের দু’প্রান্তেই চালকের কেবিন থাকবে। সেখানে থাকবে আধুনিক অনবোর্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সহজ হবে। প্রয়োজনে দুটি আট কামরার ট্রেন জুড়ে ১৬ কামরার ট্রেনও চালানো যাবে।
যাত্রীদের আরামের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় যাত্রীদের শারীরিক গঠনের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের আরামদায়ক আসন। থাকবে পর্যাপ্ত পায়ের জায়গা। এছাড়াও কামরার ভিতরে LED আলো, মাথার উপরে ব্যাগ রাখার জায়গা, বড় লাগেজ রাখার জন্য আলাদা স্ট্যান্ড এবং মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ট্রেনে থাকবে আধুনিক বায়ো-ডাইজেস্টার শৌচাগার। এর ফলে বর্জ্য উৎপাদন কমানো সম্ভব হবে। প্রতিটি সারির আসনের পাশে বড় জানালা থাকবে, যাতে যাত্রীরা বাইরের দৃশ্য ভালোভাবে দেখতে পারেন। কামরাগুলিকে যুক্ত করবে বিশেষ সিল করা গ্যাংওয়ে। এর ফলে যাত্রীরা সহজেই এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যেতে পারবেন।
যাত্রীদের সুবিধার জন্য থাকবে আধুনিক তথ্য পরিষেবা। কামরার ভিতরে লাগানো LCD স্ক্রিনে ইংরেজি, হিন্দি এবং আঞ্চলিক ভাষায় ট্রেন সংক্রান্ত তথ্য দেখানো হবে। পাশাপাশি মাইকের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘোষণা ও অডিও নির্দেশিকা দেওয়া হবে। কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীরা কামরার ভিতরে থাকা বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি ট্রেনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। এছাড়াও Wi-Fi পরিষেবার মাধ্যমে যাত্রীরা ট্রেনে আগে থেকে রাখা বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন।
বিশেষভাবে সক্ষম এবং চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে এমন যাত্রীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে। ট্রেনের মেঝে ও প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা একই রাখা হবে, যাতে সহজে ট্রেনে ওঠা-নামা করা যায়। দরজার সঙ্গে যুক্ত থাকবে বিশেষ ভাঁজ করা সিঁড়ি, যা ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝের ফাঁক কমাতে সাহায্য করবে। তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট আসন ও শৌচাগার, হুইলচেয়ার চলাচলের উপযোগী দরজা এবং ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা নির্দেশিকা থাকবে।
সারা বছর যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে প্রতিটি কামরায় দুটি করে হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং (HVAC) ইউনিট থাকবে। এর মাধ্যমে কামরার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ফলে বিভিন্ন আবহাওয়াতেও যাত্রীরা আরামে যাতায়াত করতে পারবেন। ট্রেন চলার সময় শব্দ ও কম্পন কমানোর জন্যও বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রেনের বাইরের অংশ ও মেঝেতে শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি শব্দ কমানোর বিশেষ প্রলেপ, চাকার অংশ ঢাকার কভার এবং বায়ুর চাপ সামলানোর জন্য বিশেষ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে ট্রেনের ভিতরে শব্দ ও কম্পন অনেকটাই কমবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই ট্রেন ২৫ কেভি, ৫০ হার্টজ সিঙ্গল-ফেজ AC বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চলবে। ট্রেনে থাকবে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং ব্যবস্থা। অর্থাৎ ট্রেনের গতি কমানোর সময় তৈরি হওয়া শক্তি আবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার আরও কার্যকর হবে এবং শক্তির অপচয় কমবে। ট্রেনটির বাইরের নকশা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স (CFD) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রেনের চারপাশে বাতাস কীভাবে প্রবাহিত হবে, তা কম্পিউটারের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়। ট্রেনের সামনের অংশ ও মূল কাঠামোর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাতাসের বাধা কম হয়। পাশাপাশি বাতাসের ঘূর্ণি, সুড়ঙ্গের ভিতরে বায়ুচাপের পরিবর্তন এবং দ্রুতগতিতে চলার সময় তৈরি হওয়া শব্দের প্রভাবও কমানো যায়।
এছাড়াও ট্রেনের ছাদ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরের অংশ এবং বাতাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রেনের বাইরের অংশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাতাস সহজে প্রবাহিত হতে পারে। সম্পূর্ণ সিল করা কাঠামোর কারণে ভিতরে ও বাইরের বায়ুচাপের পার্থক্যও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বিশেষ করে সুড়ঙ্গের মধ্যে দ্রুতগতিতে চলার সময় যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা সাহায্য করবে।