রিয়া দাস, সাংবাদিক : কেরলের রাজনীতিতে এখন যেন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই। পিনারাই বিজয়নের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর এবার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসবেন কে? বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট। ১৪০ আসনের বিধানসভায় ১০২টি আসন জিতে কার্যত ইতিহাস গড়েছে তারা। কিন্তু জয় এলেও স্বস্তি নেই কংগ্রেস শিবিরে। বরং সরকার গঠনের আগেই শুরু হয়েছে জোর টানাপোড়েন। কেরলের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে এখন দিল্লি থেকে তিরুবনন্তপুরম সর্বত্র তুমুল জল্পনা। দলের অন্দরে আপাতত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত তিনটি নাম কেসি বেণুগোপাল, ভিডি সতীশন এবং রমেশ চেন্নিথালা। এই তিন নেতার মধ্যে কাকে বেছে নিলে কেরলে দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় থাকবে সেটাই এখন কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্রের খবর, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দিল্লিতে একাধিক দফায় বৈঠক করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী ও দলের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল।

দলের ভিতরে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বেণুগোপাল। রাহুল গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত তিনি। দীর্ঘদিন ধরে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সংসদীয় রাজনীতিতেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট। এমনকি ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন শরিক দলের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ভালো বলেই মনে করা হয়। কংগ্রেস সূত্রে দাবি, নবনির্বাচিত অধিকাংশ বিধায়কও বেণুগোপালের পক্ষেই মত দিয়েছেন। তবে সমস্যাও রয়েছে। এবারে বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। ফলে মুখ্যমন্ত্রী হলে তাঁকে পরে উপনির্বাচনে জিতে বিধানসভায় আসতে হবে। এছাড়া ভোটের আগে কংগ্রেসের অবস্থান ছিল কোনও সাংসদ বিধানসভা ভোটে লড়বেন না। সেই নীতি থেকে সরে আসা নিয়েও দলের ভিতরে প্রশ্ন উঠছে। রাহুল গান্ধী চাইছেন সাংসদ কেসি বেণুগোপাল কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু দলের বাকি নেতারা রাহুলের সঙ্গে এক মত নন। সব মিলিয়ে জয় পেলেও অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়েছে দলের অন্দরে।
অন্যদিকে রয়েছেন ভিডি সতীশন। বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি পিনারাই সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই করেছেন। কংগ্রেসের একাংশের মতে, রাজ্যে বাম শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল সতীশনের। শুধু কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরাই নন, ইউডিএফের জোটসঙ্গী ইন্ডিয়ান মুসলিম লিগও প্রকাশ্যে তাঁকে সমর্থন করেছে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর সমর্থনে পোস্টার পড়েছে, বিক্ষোভ হয়েছে। এমনকী সতীশনকে মুখ্যমন্ত্রী না করা হলে রাজ্যে আগুন জ্বলবে এমন হুঁশিয়ারিও শোনা গিয়েছে সমর্থকদের মুখে। পরে অবশ্য দিল্লির কড়া বার্তার পর সেই পোস্টার প্রচার বন্ধ করা হয়। এই লড়াইয়ে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুখ রমেশ চেন্নিথালা। অভিজ্ঞ এই কংগ্রেস নেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দলের জন্য যথেষ্ট। সনিয়া গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত তিনি। কংগ্রেসের অনেক প্রবীণ নেতা মনে করছেন, এতদিন দলকে সময় দেওয়ার পর এবার চেন্নিথালারই মুখ্যমন্ত্রী হওয়া উচিত। অতীতে উম্মেন চাণ্ডির জন্য মুখ্যমন্ত্রিত্বের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনাও বারবার তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়া ওয়েনাড়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর হয়ে প্রচারে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথাও দলের ভিতরে আলোচনা রয়েছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, রাহুল গান্ধী যেখানে বেণুগোপালকে চাইছেন সেখানে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পছন্দ চেন্নিথালা।
রবিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে বলেছেন, তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন হচ্ছে না কেন বলে কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছিল। কেরলে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সেখানে নেতারা সিদ্ধান্তই নিতে পারছেন না। কাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। আড়াই বছর করে দুজন হবেন নাকি এক বছর করে পাঁচ জন মুখ্যমন্ত্রী হবেন কোনও সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। কর্নাটক, ছত্তীশগড়, রাজস্থানে কংগ্রেস বিভিন্ন নেতাদের পরে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে বলে আর কথা রাখেনি। এবার কেরলের পালা। জবাবে কেরলের কংগ্রেস নেতা রমেশ চেন্নিথালা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঠিক করতে তাঁর ১৫ দিন লেগেছিল। কংগ্রেস গণতান্ত্রিক দল। স্বৈরতান্ত্রিক নয়। বিজেপিতে সবকিছুই নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ ঠিক করেন।
ফলে পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে জয়ী হয়েও অস্বস্তিতে কংগ্রেস। কর্নাটকে সিদ্দারামাইয়া ও ডিকে শিবকুমারের দ্বন্দ্ব যে পরিস্থিচি তৈরি করেছিল কেরলে সেই ছবির পুনরাবৃত্তি চাইছে না হাইকম্যান্ড। তাই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে গৌষ্ঠীদ্বন্দ্ব কমিয়ে সর্বসম্মত মুখ খুঁজতেই সময় নিচঅছে নেতৃত্ব। যদিও আগামী ২৩ মে বর্তমান বিধানসভার শেষ হচ্ছে। তার আগেই নতুন সরকার গঠন করা বাধ্যতামূলক। এই মুহূর্তে দিল্লির দরবারে ঘনঘন যাতায়াত করছেন কেরল কংগ্রেসের নেতারা। প্রকাশ্যে সবাই বলছেন, হাইকম্যান্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু ভিতরের চাপা অসন্তোষ যে এখনও রয়েই গেছে তা স্পষ্ট। তাই এখন গোটা দেশের নজর কেরলের দিকে। শেষ পর্যন্ত হাইকম্যান্ড কাকে বেছে নেয় সেটাই ঠিক করে দেবে কেরলে কংগ্রেসের নতুন অধ্যায়ের মুখ।