শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ভারতের জ্বালানি পরিস্থিতি এই মুহূর্তে স্থিতিশীল রয়েছে। চিন্তার কোনও কারণ নেই। ইরান, ইজরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে হরমুজ পেরিয়ে ভারত অভিমুখে রওনা দিয়েছে একাধিক গ্যাস ও তেলবাহী জাহাজ। বুধবার সর্বদলীয় বৈঠকে নিশ্চিত করল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, বৈঠকে সব দল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে, সংকটের সময়ে সবরকমভাবে সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে।

ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার চলমান সংঘাত, ভারতের উপর তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমস্ত দলের প্রতিনিধিরাই।
কিরেন রিজিজু বলেন, বিরোধী দলের সব নেতারা বলেছেন যে এই সংকটকালে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী যে সিদ্ধান্তই নিক, যে পদক্ষেপই গ্রহণ করুক, সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে সমর্থন করবেন। সরকারের তরফে যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভারতের অবস্থান, জ্বালানি পরিস্থিতি তথ্য-সহ বিস্তারিত জানানো হয় বিরোধী দলের নেতাদের। সূত্রের খবর, বৈঠকে সরকার পক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানি আমদানির জন্য অগ্রিম বুকিং করছে। এর জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে আলোচনা চালানো হচ্ছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলপিজি আসা নিয়ে বিরোধী দলগুলির উদ্বেগের জবাবে সরকার বলেছে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই চারটি জাহাজ ভারতের বন্দরে ভিড়বে বলেই আশা করা হচ্ছে। সরকার জোর দিয়ে বলেছে, কোনও ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। বিরোধীরা কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে সরকারের তরফে দাবি করা হয়, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। উদ্বেগের কিছু নেই এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। সকলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে যে কোনও সময় বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী কেন্দ্রীয় সরকার।
একথা বললেও এলপিজি ও পিএনজি নিয়ে একাধিক নির্দেশিকার কারণ কী, জানায়নি কেন্দ্র। সিঙ্গল সিলিন্ডার ২৫ দিনে বুকিং নিয়মের পর ৩৫ দিনে ডবল সিলিন্ডার বুক করা যাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। যদি বিতর্কের ঝড় উঠতে শুরু করতেই আবারও ২৫ দিনের নিয়মে ফিরে গিয়েছে কেন্দ্র। এছাড়াও এলপিজি-র বদলে নলবাহিত গ্যাস পিএনজি-তে জোর দেওয়া হচ্ছে। যে অঞ্চলে নলবাহিত রান্নার গ্যাস নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখান গ্রাহকরা তা না নিলে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে বাড়ির এলপিজি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্র।
এই বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদের উভয় কক্ষেই বক্তব্য রাখেন এবং সতর্ক করেন যে পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাতের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানি, সার, সরবরাহ শৃঙ্খল, লজিস্টিকস ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজরদারির জন্য সাতটি বিশেষ গোষ্ঠী গঠন করেছে।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সেই আবহেই ভারতের অবস্থান নিয়ে বিরোধীদের একাধিক প্রশ্ন ও সমালোচনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক সংসদীয় বক্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে একসঙ্গে বসিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে বলে সূত্রের খবর।
অন্য়দিকে, রবিবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সহ প্রমুখ। বৈঠকের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূলত, পেট্রোলিয়াম, অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠকটি হয়েছে। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সাফ-বার্তা যুদ্ধের আঁচ যেন সাধারণ মানুষের উপরে না পড়ে। তাদের রক্ষা করতে হবে। সরকারি সূত্রে খবর, ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠকে যুদ্ধ ও সঙ্কট নিয়ে স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী-দুই উপায় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। যাতে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় থাকে। পাশাপাশি শক্তি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ কয়লা মজুত রাখা হবে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলিতে। যাতে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি বা সঙ্কট দেখা না দেয়। এছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল, কেমিক্যাল, ওষুধ ও অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সারের সরবরাহও বজায় রাখতে বলা হয়েছে, যাতে খাদ্য সঙ্কট দেখা না দেয়। ভবিষ্যতে বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করা হয়।
এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বৈঠক নিয়ে লিখেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠক করলাম। আমরা স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছি। কৃষকদের জন্য সারের জোগান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে একাধিক আমদানির পথ তৈরি, রফতানির জন্য নতুন জায়গা খুঁজে নেওয়া সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা যুদ্ধের প্রভাব থেকে নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জানা গিয়েছে, মূলত দেশের জ্বালানি সরবরাহ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে স্বাভাবিক থাকে এবং দেশজুড়ে বন্টন প্রক্রিয়া যাতে সুষ্ঠুভাবে চালু থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। বৈঠকে মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য যেকোনও বিঘ্ন মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে PIB। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশজুড়ে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে। আতঙ্কের বুকিংয়ের প্রবণতাও কমেছে।
সরকার জানিয়েছে, রাজ্যগুলিতে বাণিজ্যিক এলপিজি-র সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলির জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে, রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পিএনজি সংযোগ বাড়ানোর জন্য। যাতে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক, দু ক্ষেত্রেই বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটে। গ্যাস মজুত করে রাখা বা কালোবাজারি রুখতে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। দেশের সব বড় বন্দরগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্ম চলছে এবং কোথাও কোনও সমস্যা নেই বলে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে কেন্দ্র। সেই সঙ্গে, ওই অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইরান, ইজরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মোদী এই পরিস্থিতিকে ধৈর্য ও সচেতনতার সঙ্গে মোকাবিলার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন ঘটেছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরানের উপর হামলার পর এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
পাল্টা জবাবে ইরান ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে হামলা চালায়। এই পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত, জর্ডন, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, ইজরায়েল ও ইরানের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
৪৮ ঘন্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না করলে ইরানকে ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টা জবাবে তেহরান জাননায় হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ নয়। বিদেশি জাহাজগুলো এখনও এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারে তবে, ইজরায়েল, আমেরিকা এবং তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর জন্য ওই সমুদ্রপথ বন্ধ। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা বা আইএমও-র কাছে ইরানের প্রতিনিধি আলি মুসাভি বলেছেন, বিদেশি জাহাজগুলো এখনও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারে। তবে শর্ত হল, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে তাদের তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে হবে। ব্রিটেনে নিযুক্ত ইরানের দূত হিসেবে বক্তব্য রাখার সময় মুসাভি জোর দিয়ে বলেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও বজায় রাখতে হবে।পাশাপাশি, এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইরান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, এই সর্বদলীয় বৈঠককে কেন্দ্রের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে – যেখানে একদিকে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা যে দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।