আভি না যাও ছোড় কার, কি দিল আভি ভরা নেহি । কখনও কখনও একটা গান এমনভাবে হৃদয়ে গেঁথে যায় যেন জীবনের কোনও অধ্যায়ের জন্যই লেখা হয়েছে। আজ সেই গানটার কথাই বারবার মনে পড়ে। কারণ ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের একটা খেলা নয়। এটা কোটি কোটি মানুষের অনুভূতি, স্বপ্ন, ভালোবাসা আর চোখের জলের আরেক নাম। আর সেই অনুভূতির সঙ্গে যখন জড়িয়ে থাকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মতো একজন কিংবদন্তির নাম। তখন পরাজয়ও ইতিহাস হয়ে যায়।

বিশ্বকাপে আর দেখা যাবে না সিআরসেভেনকে। শেষ সুযোগেও ব্যর্থ হলেন তিনি। শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে তাঁকে। চোখের জলে মাঠ ছেড়েছেন রোনাল্ডো। তারপরেই রোনাল্ডোর মুখ থেকে শোনা গেল ইউরো জয়ের প্রসঙ্গ। খেলা শেষে সাংবাদিকদের সামনে রোনাল্ডো জানিয়েছেন তিনি পর্তুগালের জার্সি গায়ে চাপানোর আগে বিশ্বমঞ্চে পর্তুগাল তো কিছুই জিততে পারেনি। তাঁর সময়ে তিনটি ট্রফি ঢুকেছে দেশের ক্যাবিনেটে। রোনাল্ডো বলেন, ‘আমি পর্তুগালের হয়ে তিনটে ট্রফি জিতেছি। আমি আসার আগে পর্তুগাল একটা ট্রফিও। জিততে পারেনি, এটাই বাস্তব। পর্তুগাল এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ট্রফি জিতেছে ২০১৬ সালে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ সত্যি বলতে ইউরো কাপ জয় আমার কাছে বিশ্বকাপ জেতারই সমান।’
রোনাল্ডোর সময়ে পর্তুগাল ২০১৬ সালের ইউরো কাপ, ২০১৯ ও ২০২৫ সালের নেশনস লিগ জিতেছে। একটা সময় ছিল পর্তুগাল মানেই ছিল সম্ভাবনার দল। প্রতিভা ছিল, স্বপ্ন ছিল, কিন্তু বড় মঞ্চে ট্রফির দেখা মিলত না। তারপর এলেন একজন। মাদেইরার ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে আসা এক কিশোর, যার চোখে ছিল শুধু একটা স্বপ্ন। পৃথিবীর সেরাদের মধ্যে নিজের নাম লিখে যাওয়া। সেই ছেলেটাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ইউরো জয়, উয়েফা নেশনস লিগ, পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অসংখ্য লিগ শিরোপা, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন। ফুটবলে যা যা অর্জন করার প্রায় সবই করেছেন তিনি। কিন্তু একটা অপূর্ণতা যেন সারাজীবন তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিবারই কোটি কোটি সমর্থক বিশ্বাস করেছেন, “হয়তো এবার…”। ঠিক যেমন একসময় ফুটবলপ্রেমীরা অন্য এক কিংবদন্তির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চেয়েছিল। তেমনই অনেকেই চেয়েছিলেন রোনাল্ডোর ক্যারিয়ারটাও বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে পূর্ণতা পাক। ফুটবল সবসময় রূপকথার মতো শেষ হয় না। অনেক সময় সবচেয়ে বড় নায়কের গল্পেও থেকে যায় একটা অপূর্ণ অধ্যায়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর যখন রোনাল্ডো মাঠে ভেঙে পড়লেন তখন সেই দৃশ্যটা শুধু পর্তুগালের সমর্থকদের নয় গোটা ফুটবল বিশ্বের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। একজন ফুটবলারের কান্না নয়। যেন একজন যোদ্ধার শেষ লড়াইয়ের ক্লান্তি চোখের জলে ধরা পড়েছিল। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যিনি বিশ্বফুটবলের আলো ছিলেন তাঁর চোখের জল যেন কোটি কোটি মানুষের আবেগ হয়ে উঠেছিল। বিশ্বকাপ জেতাতে এসেছিলেন। পারেননি। তাই সরে যাচ্ছেন। এমনটাই জানিয়ে দিলেন রবার্তো মার্তিনেজ। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর পদত্যাগ করেছেন বেশ কয়েকটি দেশের কোচ। সেই ধারা দেখা গেল পর্তুগালেও। পদত্যাগ করলেন দলের কোচ। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোদের হারের দায় নিজের ঘারে নিলেন তিনি।
ম্যাচ শেষের পর আরও একটি বিষয় নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অনেক সমর্থকের অভিযোগ, রোনাল্ডো যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখন তাঁর সতীর্থদের অনেককেই পাশে দেখা যায়নি। এই দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মত, যে মানুষটা বছরের পর বছর নিজের দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে জয় এনে দিয়েছেন তাঁর এমন কঠিন মুহূর্তে দলের আরও বেশি সমর্থন পাওয়া উচিত ছিল। আবার অন্য একটি অংশের মতে, সম্প্রচারিত ক্যামেরায় সব মুহূর্ত ধরা পড়ে না তাই কেবল ভিডিওর কয়েকটি দৃশ্য দেখে পুরো বিষয়টি বিচার করা ঠিক নয়। তবে এটুকু সত্যি, সেই মুহূর্তের ছবি অসংখ্য সমর্থকের মনে কষ্টের জন্ম দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই লিখেছেন, “রোনাল্ডোর মতো একজন কিংবদন্তির এই সম্মান প্রাপ্য ছিল না।” কেউ বলেছেন, “যে মানুষটা পর্তুগালকে নতুন পরিচয় দিয়েছে তাঁকেই সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে একা দাঁড়িয়ে থাকতে হল।” আবার অনেক আবেগপ্রবণ সমর্থক ক্ষোভে জানিয়েছেন, তাঁরা আর পর্তুগালকে সমর্থন করবেন না। যদিও আবেগের মুহূর্তে এমন প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক।তবুও এটাও মনে রাখা দরকার ফুটবল একটি দলগত খেলা। জয় যেমন সবার, পরাজয়ও তেমন সবার।
রোনাল্ডোর অবদান কোনও একটি ম্যাচের ফল দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর আগে পর্তুগাল আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্মানিত দল ছিল ঠিকই। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাঁর নেতৃত্বেই দেশ জিতেছে বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। আজকের পর্তুগাল যখন কোনও টুর্নামেন্টে নামে তখন তারা আর শুধু অংশগ্রহণকারী নয় তারা শিরোপার দাবিদার। এই মানসিকতা, এই আত্মবিশ্বাস, এই জয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার পেছনে রোনাল্ডোর অবদান অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। ফুটবলের ইতিহাস শুধু ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। লেখা হয় সাহস দিয়ে, লেখা হয় পরিশ্রম দিয়ে, লেখা হয় কখনও হার না মানা মানসিকতা দিয়ে। মাদেইরার এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে পৃথিবীকে শিখিয়েছেন, প্রতিভা জন্মগত হতে পারে। কিন্তু কিংবদন্তি হয়ে ওঠার জন্য প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে গড়তে হয়। অসংখ্য ব্যর্থতা, সমালোচনা, বিদ্রূপ সবকিছুকে হার মেনে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন। একটা লড়াইয়ের নাম ক্রিশিয়ানো রোনাল্ডো।
হয়তো তাঁর ক্যাবিনেটে বিশ্বকাপ নেই। তাই বলে কি তাঁর উত্তরাধিকার ছোট হয়ে যায়? ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন যাঁরা একটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতি বদলে দিতে পেরেছেন। রোনাল্ডো তাঁদেরই একজন। তিনি শুধু গোল করেননি, তিনি লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন, পড়ে যাওয়া অপরাধ নয়, উঠে দাঁড়ানোই আসল পরিচয়। হয়তো আগামী বিশ্বকাপে পর্তুগালকে দেখা যাবে নতুন প্রজন্ম নিয়ে। নতুন মুখ, নতুন নায়ক, নতুন স্বপ্ন। গ্যালারিতে হয়তো বসে থাকবেন একজন পরিচিত মানুষ। গোল হলে হাততালি দেবেন, গোল মিস হলে হতাশ হবেন, আবার পরের মুহূর্তেই নিজের দেশের জন্য চিৎকার করবেন। কিন্তু তাঁর গায়ে থাকবে না সেই বিখ্যাত সাত নম্বর জার্সি। তিনি তখন আর মাঠের নায়ক নন, তিনিব তখন ইতিহাস।
কথায় আছে না যে সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। সব গল্পের শেষ হ্যাপি এন্ডিং হয় না। কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের গল্প ট্রফির সংখ্যায় নয়, মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো সেই মানুষদের একজন।
হয়তো বিশ্বকাপ তাঁর হাতে ওঠেনি। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও চ্যাম্পিয়ন। রেকর্ড একদিন ভাঙবে, ট্রফি নতুন কেউ জিতবে, নতুন নায়ক আসবে। প্রতিদিন নিজের সীমাকে চ্যালেঞ্জ করা, অসম্ভবকে সম্ভব করার বিশ্বাস, আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন সেটা কোনওদিন পুরোনো হবে না। বিদায় নয়, কিংবদন্তিরা কখনও বিদায় নেন না। তাঁরা থেকে যান স্মৃতিতে, অনুপ্রেরণায়, আর প্রতিটি নতুন স্বপ্নের শুরুতে।
শেষ পর্যন্ত একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশ্বকাপ না জিতলে কি একজন কিংবদন্তির পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়? নাকি তাঁর লড়াই, তাঁর ত্যাগ, তাঁর অনুপ্রেরণাই তাঁকে অমর করে রাখে? আপনার কাছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কী? শুধুই একজন ফুটবলার নাকি কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা?