বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণবঙ্গে ফের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সুন্দরবন উপকূলজুড়ে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে শুক্রবার থেকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল ঝড়বৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া দফতর। এই পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি, যাঁরা ইতিমধ্যেই ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছেন, তাঁদের দ্রুত বন্দরে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল এলাকায় তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। সুন্দরবন পুলিশ জেলার অধীন ফ্রেজারগঞ্জ কোস্টাল থানার পুলিশ স্পিডবোট নিয়ে নদীপথে নামেন। নদীর বিভিন্ন ঘাট, খাঁড়ি এবং মাছ ধরার গুরুত্বপূর্ণ রুট ধরে চলে মাইকিং। পুলিশের তরফে বারবার ঘোষণা করা হয়— আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো মৎস্যজীবী যেন গভীর সমুদ্রে পাড়ি না দেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের উপর সৃষ্ট নিম্নচাপ ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে। তার জেরেই দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে। কিছু এলাকায় তার চেয়েও বেশি বেগে দমকা হাওয়া আছড়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আবহাওয়ায় সমুদ্র খুব দ্রুত উত্তাল হয়ে ওঠে। নদী ও মোহনায় জলস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে ছোট ট্রলার বা মাছ ধরার নৌকা মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে পারে। সুন্দরবন অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নদীপথে আবহাওয়ার আচমকা পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যে শান্ত নদী ভয়ংকর রূপ নেয়। সেই কারণেই আগাম সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
ফ্রেজারগঞ্জ, বকখালি, নামখানা ও সংলগ্ন উপকূলবর্তী অঞ্চলের বহু পরিবার জীবিকার জন্য সম্পূর্ণভাবে মৎস্য শিকারের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন শতাধিক ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। দুর্যোগের সতর্কতা জারি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগে রয়েছেন মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবার। অনেকেই জানিয়েছেন, সমুদ্রে থাকা অবস্থায় ঝড় শুরু হলে জীবন নিয়ে ফেরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় মৎস্যজীবী ধীরেন দাস বলেন, প্রশাসনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় মাছ ধরার তাড়নায় আবহাওয়ার সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে বড় বিপদের মুখে পড়তে হয়। পুলিশের মাইকিং ও সরাসরি সতর্কবার্তা অনেককে সচেতন করবে বলেই তাঁদের মত।
ফ্রেজারগঞ্জ কোস্টাল থানার পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। উপকূলবর্তী সমস্ত ঘাটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নদীপথে নিয়মিত টহলদারি চালানো হচ্ছে যাতে কোনো ট্রলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গভীর সমুদ্রে না যায়। প্রয়োজনে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে প্রশাসন উপকূল এলাকার বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় না থাকা, অপ্রয়োজনে নদী বা সমুদ্রের ধারে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মৎস্যজীবীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে যাতে সমুদ্রে থাকা ট্রলারগুলিকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়।
প্রবল বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া এবং উত্তাল সমুদ্র— সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিন সুন্দরবন উপকূলে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে আগাম সতর্কতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে প্রশাসন। এখন সকলের নজর আকাশ ও সমুদ্রের দিকে— দুর্যোগ কতটা ভয়াবহ রূপ নেয়, সেটাই দেখার।