রবিবার বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ভ্যাকসিন সরবরাহ, উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে ভারত বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার প্রতি তার অঙ্গীকার অব্যাহত রেখেছে। তিনি দেশের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ ‘সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার’—এর ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেন।জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত চিন্ময় অমৃত মহোৎসব গ্লোবাল সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর কোভিড-১৯ অতিমারির সময় অন্যান্য দেশকে ভারতের সহায়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে ভারতের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
জয়শঙ্কর বলেন, “কোভিড অতিমারির সময় ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, নিজেদের দেশে টিকাকরণ কর্মসূচি চলতে থাকা সত্ত্বেও এমন দেশগুলিতে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে, যারা অন্যথায় এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারত।”ভারতের উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্বের প্রসঙ্গে বিদেশমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে ভারতের উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব ৭৮টি দেশজুড়ে বিস্তৃত, যেখানে শত শত প্রকল্প রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ভারতের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের জন্যও সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলি ভারতের নিজস্ব জাতীয় লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।”
জয়শঙ্কর বিভিন্ন অঞ্চলের উদাহরণ তুলে ধরে প্রয়োজনের সময় অন্যান্য দেশকে জরুরি সহায়তা প্রদানে ভারতের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, “ভারতের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিয়মিতভাবে প্রকাশ পায়। নেপাল হোক বা শ্রীলঙ্কা, কিংবা ভেনেজুয়েলা বা জ্যামাইকা সর্বত্রই ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর ভাবনা বাস্তবে অনুসরণ করা হয়। এটি কেবল কথার কথা নয়, বাস্তবেও এর প্রতিফলন ঘটে।”বক্তব্যের সময় জয়শঙ্কর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন।তিনি বলেন, “মানবজাতি দীর্ঘকাল ধরে এমন এক বিতর্কের সাক্ষী, যেখানে এক পক্ষ প্রতিযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেয়, আর অন্য পক্ষ সহযোগিতার মধ্যে মহত্ত্ব খুঁজে পায়। এই দ্বন্দ্ব ব্যক্তি বা সমাজের স্তরে দেখা যেতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তা বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিশ্বের সম্মিলিত ও সহযোগিতামূলক মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছিল আট দশক আগে, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়।”জাতিসংঘ সনদের প্রথম অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল “সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা।” তিনি আরও বলেন, “তাই জাতিসংঘ দিবস উদ্যাপনের সময় ঐক্য ও একাত্মতার চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমাদের এই সমাবেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বিশ্বের সামনে যে চ্যালেঞ্জই আসুক বা যে সুযোগই তৈরি হোক, সম্মিলিতভাবে কাজ করলেই সেগুলির সবচেয়ে কার্যকর সমাধান সম্ভব।”
চলমান সংঘাতগুলির প্রভাব সম্পর্কে বিদেশমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে থাকা মানুষ এবং অর্থনীতিও এর পরিণতি ভোগ করছে।জয়শঙ্কর বলেন, “বর্তমানে বিশ্বে দুটি বড় সংঘাত চলছে ইউক্রেনে এবং পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে। যুদ্ধ থেকে বহু দূরে থাকা সমাজ, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষ, যাঁদের এই সংঘাতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনও ভূমিকা নেই, তাঁরাও এর মূল্য চোকাচ্ছেন। আমরা অসহায় দর্শক হয়ে থাকতে পারি না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যখন বলি যে সংলাপ ও কূটনীতিই একমাত্র সমাধানের পথ, তখন ভারত আসলে বিশ্বজনমতেরই প্রতিফলন ঘটায়। আমরা নিজেরাও এই লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং এই উদ্দেশ্যে অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে কাজ করতেও প্রস্তুত।”জাতিসংঘের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, এই বিশ্ব সংস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলিকে স্বীকার করে সেগুলির সমাধান করা জরুরি। তাঁর মতে, সংস্কারমূলক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি প্রতিদিন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।তিনি বলেন, “বিশ্বের বৃহৎ অংশকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা যায় না। জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দিতে হবে; বিশ্বব্যাপী সংকটের ক্ষেত্রে কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করলে চলবে না।”
সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশ্বব্যাপী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।তিনি বলেন, “এই উপলক্ষে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা পরিবর্তনের গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি, আসুন আমরা একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার নতুন করে গ্রহণ করি। আমরা এক, আমাদের স্বার্থ অভিন্ন এবং আমরা ঐক্যবদ্ধ।”প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠাতা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যার মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী