দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির মঞ্চে একই সময়ে দুই ভিন্ন অভিমুখে বাংলাদেশের দুই প্রতিনিধি দলের যাত্রা। একদিকে, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআইয়ের প্রধান মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদ। অন্যদিকে, চিনের গুয়াংঝৌয়ের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের চার আধিকারিক। সময়ের ব্যবধান কয়েক ঘণ্টা। গন্তব্য আলাদা, সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্যও আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণের মধ্যে এই দুই সফর ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে কৌতূহল। আর সেই কৌতূহলের কেন্দ্রে উঠে আসছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবিতে ঠিক কোন পথে এগোবে ঢাকা?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
রবিবার, ২৫ অক্টোবর এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে দিল্লি পৌঁছন বাংলাদেশের এনএসআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদ। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর এই সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্য অষ্টম দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী সম্মেলনে যোগ দেওয়া। একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, মাদক পাচার, মানব পাচার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। আগামী ২৮ অক্টোবর তাঁর বাংলাদেশে ফেরার কথা বলে জানা গিয়েছে।
এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহের কারণও স্পষ্ট। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা চলছে। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্ব রয়েছে। যদিও সারওয়ার ফরিদের দিল্লি সফরে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট বৈঠক হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি তবু বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি বর্তমান কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
একই সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের চার আধিকারিকের চিন সফরও নজর কেড়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা চিনের গুয়াংঝৌয়ে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন পণ্য ও সরঞ্জাম পরিদর্শন এবং একটি কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়েছেন। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের এই কর্মসূচি চলার কথা। ফলে দিল্লি ও চিন। দুই সফরের মধ্যে সরাসরি কোনও যোগসূত্র রয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোরও অবকাশ নেই।
কিন্তু এই দুই বিদেশ সফরের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির একটি হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন। ২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতে রয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরব বাংলাদেশের বর্তমান সরকার। এই দাবি ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। রবিবার, ২৫ অক্টোবর, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ ফের জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতকে একাধিকবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে ঢাকার অবস্থানে কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি।
চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে পারেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে আলোচনা ছড়িয়েছে, তা নিয়েও মুখ খুলেছেন সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনও ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে দেওয়া হবে না। মন্ত্রীর বক্তব্যে ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কোনও নিশ্চিত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। আওয়ামী লিগ সভানেত্রী দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী তাঁকে কারাগারে যেতে হতে পারে। সেই সম্ভবনা বিবেচনায় রেখেই তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে হাসিনা একাধিক সাক্ষাৎকার জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন আমি দেশে ফিরে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাইব। তবে যেহেতু একটি মামলায় তাঁর মৃত্যুদন্ডে সাজা হয়েছে ফলে তাঁকে বিচারবিভাগীয় হেফাজত অর্থাৎ কারাগারে থেকে আইনি লড়াই চালাতে হতে পারে। ফলে শেখ হাসিনা আদৌ কবে ফিরবেন, কিংবা তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কোন দিকে এগোয়, আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সমীকরণে কী প্রভাব পড়ে সেটাই এখন দেখার। আপনার কী মনে হয় শেখ হাসিনাকে কি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরানো হবে?