একদিকে গণগ্রেফতার। অন্যদিকে ব্লক রেইড, তল্লাশি আর নির্যাতনের অভিযোগ। আর এই সবকিছুর পিছনে কি রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা? এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে সরাসরি নিশানা করলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অভিযোগ, বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে নির্বিচারে গ্রেফতার করা হচ্ছে নেতা-কর্মীদের। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। মঙ্গলবার, আওয়ামী লীগের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিবৃতিতে শেখ হাসিনার অভিযোগ, বাংলাদেশে আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। তাঁর আরও দাবি, কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার আওয়ামী লীগকে দেশ থেকে মুছে ফেলার অভিযান শুরু করেছে।
গ্রেফতারি ও তল্লাশি নিয়ে কী অভিযোগ হাসিনার? শেখ হাসিনার অভিযোগ, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্লক রেইড চালাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে। গ্রেফতার করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের। বিশেষ করে গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যে পরিস্থিতি একসময় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন দেশের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বিস্ফোরক দাবি, বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
শুধু গ্রেফতারি নয়। মিথ্যা মামলা, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা বিপন্ন। এখানেই প্রশ্ন, কেন এত ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা? আর আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলার অভিযোগের পিছনে রয়েছে কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট?
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে ২০২৪ সালে ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন তিনি। এরপর মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। হাসিনার আমলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়াও শুরু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশনও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একদিকে রয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার, অন্যদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তার নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারও চলছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চরম সাজা দেয়। হাসিনা অবশ্য এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারির প্রশ্নটি আরও জটিল। কারণ, একদিকে অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে নির্বিচারে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
শেখ হাসিনার অভিযোগ শুধু গ্রেফতারি বা তল্লাশিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তারেক রহমানের সরকারকে আক্রমণ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং সারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, বাড়ছে বেকারত্ব এবং থমকে যাচ্ছে বিনিয়োগ। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। অর্থাৎ, শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একদিকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগও সামনে আনছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদল, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা সব মিলিয়ে প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও যথেষ্ট উত্তপ্ত। এবার সেই পরিস্থিতিতেই গণগ্রেফতার, তল্লাশি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সরব হলেন শেখ হাসিনা।
আগামী ডিসেম্বরে দেশের ফেরার কথা জানিয়েছেন হাসিনা। তার আগে সাম্প্রতিকালে তাঁর একের পর বিবৃতি চাপ বাড়িয়েছে বিএনপি শিবিরে। আন্তর্জাতিক মহলে পড়তে হচ্ছে প্রশ্নের মুখেও। গণ-গ্রেফতারি নিয়ে হাসিনার এই বিবৃতির পিছনে কি রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে?