আপনার কষ্টের জমানো টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখার পরিকল্পনা করছেন? তাহলে একটু অপেক্ষা করা লাভজনক হতে পারে! কারণ, দেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনের জেরে আগামী দিনে ব্যাঙ্কের FD-তে সুদের হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একদিকে বাড়ছে খুচরো মুদ্রাস্ফীতি, অন্যদিকে সুদের হার বাড়িয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। ফলে ব্যাঙ্কগুলির উপরও আমানতের সুদ বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান, আগামী কয়েক মাসে FD-র সুদের হার আরও কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাহলে কি এখনই FD-তে টাকা রাখা উচিত নয়? নাকি সুদ বাড়ার অপেক্ষায় বসে থাকবেন? আর সুদের হার ১ শতাংশ বাড়লে আপনার জমানো টাকায় কতটা বাড়তি লাভ হতে পারে?

কেন বাড়তে পারে FD-র সুদ?
FD-র সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনার পিছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কারণ। প্রথমত, দেশের খুচরো মুদ্রাস্ফীতি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের খুচরো মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৫৪ শতাংশে। আগস্টে এই হার ছিল ৪.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মূল্যবৃদ্ধির হার অনেকটাই বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর চাপ পড়ে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত। গত ৭ অক্টোবর RBI রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি, নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নীতি-অবস্থান বদলে করা হয়েছে ‘ক্যালিব্রেটেড টাইটেনিং’। এর অর্থ, আপাতত সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কম। ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সুদ বাড়ানো অথবা বর্তমান হার বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
FD-র সুদ বাড়ার সঙ্গে RBI-র সম্পর্ক কী?
এখানেই রয়েছে আসল বিষয়। RBI রেপো রেট বাড়ালে ব্যাঙ্কগুলির ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যাঙ্কগুলিকে পর্যাপ্ত আমানত সংগ্রহের জন্যও প্রতিযোগিতা করতে হয়। ফলে আমানতকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যাঙ্কগুলি FD-র সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী এক বছরে FD-র সুদে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, RBI রেপো রেট বাড়ালেই সব ব্যাঙ্ক সঙ্গে সঙ্গে FD-র সুদ বাড়ায় না। কোন ব্যাঙ্ক কতটা সুদ বাড়াবে, তা নির্ভর করে তাদের তহবিলের প্রয়োজন, বাজারের পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগী ব্যাঙ্কগুলির সুদের হারের উপর।
সুদ ১ শতাংশ বাড়লে কতটা লাভ?
এবার একটি হিসাব বুঝে নেওয়া যাক। ধরুন, আপনি ২ লক্ষ টাকা পাঁচ বছরের জন্য FD-তে জমা রাখলেন। বর্তমানে উদাহরণ হিসেবে ৬.২৫ শতাংশ সুদের হারে পাঁচ বছর পরে আপনার মোট টাকা হতে পারে প্রায় ২ লক্ষ ৭২ হাজার ৭০৮ টাকা। এবার যদি সুদের হার ১ শতাংশ বেড়ে ৭.২৫ শতাংশ হয়, তাহলে একই ২ লক্ষ টাকার FD-র মেয়াদ শেষে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ২ লক্ষ ৮৬ হাজার ৪৫২ টাকা। অর্থাৎ, সুদের হার ১ শতাংশ বাড়লে বাড়তি পাওনা হতে পারে প্রায় ১৩ হাজার ৭৪৪ টাকা। তবে এই হিসাবটি একটি নির্দিষ্ট সুদের হার ও চক্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে করা উদাহরণ। প্রকৃত রিটার্ন নির্ভর করবে ব্যাঙ্কের সুদের হার, FD-র ধরন, সুদ জমার পদ্ধতি এবং অন্যান্য শর্তের উপর। করের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
তাহলে এখনই FD করবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সুদের হার বাড়ার আশায় সমস্ত টাকা বিনিয়োগ আটকে না রেখে মাঝামাঝি একটি কৌশল নেওয়া যেতে পারে। যেমন, আপনার হাতে যদি ১২ লক্ষ টাকা থাকে, তাহলে পুরো টাকা একসঙ্গে একটি FD-তে না রেখে চারটি ভাগে ভাগ করতে পারেন। প্রতিটি ৩ লক্ষ টাকা করে এক বছর, দুই বছর, তিন বছর এবং চার বছরের FD-তে রাখা যেতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় FD Laddering। এর সুবিধা হল, নির্দিষ্ট সময় অন্তর আপনার FD-র মেয়াদ শেষ হবে। তখন বাজারে সুদের হার বেশি থাকলে নতুন করে সেই হারে FD করার সুযোগ পাবেন। আবার সব টাকা একসঙ্গে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রাখতেও হবে না।
বিনিয়োগের আগে সতর্ক থাকুন
তবে FD করার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই দেখে নেবেন। প্রথমত, ব্যাঙ্কের সুদের হার কত। দ্বিতীয়ত, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টাকা তুললে কোনও জরিমানা বা সুদ কমানোর নিয়ম রয়েছে কি না। তৃতীয়ত, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত সুদের সুবিধা রয়েছে কি না। এছাড়া, ব্যাঙ্কের আমানতের ক্ষেত্রে DICGC-র বিমা সুরক্ষার সীমা মাথায় রাখুন। একই ব্যাঙ্কে একজন আমানতকারীর মূলধন ও সুদ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিমা সুরক্ষা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং RBI-র রেপো রেট বৃদ্ধির জেরে FD-র সুদের হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সুদ কতটা বাড়বে, কোন ব্যাঙ্ক আগে বাড়াবে এবং কত দিনের মধ্যে বাড়াবে- তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তাই শুধু বেশি সুদের আশায় বিনিয়োগ পিছিয়ে না দিয়ে নিজের আর্থিক লক্ষ্য, টাকার প্রয়োজন এবং বিনিয়োগের সময়সীমা বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। কারণ, FD-তে ভালো রিটার্ন পাওয়ার পাশাপাশি নিজের জমানো টাকার নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনের সময় টাকা হাতে পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।