বিশ্বজিৎ দেবনাথ, নিজস্ব সংবাদদাতা : পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ মায়াপুর। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন নদিয়ার এই আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্রে। কেউ আসেন ইসকনের মন্দির দর্শনে, কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা মুহূর্ত কাটাতে। আর পর্যটকদের এই বিপুল সমাগমকে কেন্দ্র করে মায়াপুরের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রেস্তরাঁ এবং খাবারের দোকান।

কিন্তু যে খাবারের ভরসায় পর্যটকেরা দিনের পর দিন এই দোকানগুলিতে ভিড় করছেন, সেই খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত? রান্নাঘরের পরিবেশই বা কেমন? দোকানগুলির প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন রয়েছে তো? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার ময়দানে নামল খাদ্য সুরক্ষা দফতর। শুক্রবার সকালে মায়াপুরের ইসকন মন্দির সংলগ্ন বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানে আচমকা অভিযান চালাল খাদ্য সুরক্ষা দফতর এবং ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকদের একটি দল। সঙ্গে ছিল পুলিশও।
মায়াপুরের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে এই বিশেষ পরিদর্শন অভিযান। বিশেষ করে ইসকন মন্দির সংলগ্ন রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও স্থায়ী খাবারের দোকানগুলিতে নজরদারি চালান আধিকারিকেরা। দোকানগুলিতে খাবার কীভাবে তৈরি হচ্ছে, রান্নাঘরের পরিবেশ কতটা পরিচ্ছন্ন, খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি হোটেল ও রেস্তরাঁগুলির ট্রেড লাইসেন্স ও ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা FSSAI-এর প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করেন তাঁরা।
আর এই অভিযান চালাতে গিয়েই সামনে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর ছবি। খাদ্য সুরক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকটি হোটেল ও রেস্তরাঁর রান্নাঘরে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের হদিশ পান আধিকারিকেরা। কোথাও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় খাবার তৈরি হচ্ছে, কোথাও আবার খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। এমনকি কয়েকটি দোকানের রেফ্রিজারেটর খুলতেই উদ্ধার হয় পচা দই, নষ্ট হয়ে যাওয়া ময়দা এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা। কারণ, এই ধরনের খাবার পরিবেশন করা হলে তা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শুধু খাবারের গুণগত মান কিংবা রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতাই নয়, অভিযানে সামনে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশ কয়েকটি হোটেল ও খাবারের দোকানের মালিক প্রয়োজনীয় সরকারি নথি দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ। অনেকের কাছেই ছিল না বৈধ ট্রেড লাইসেন্স কিংবা FSSAI-এর অনুমোদনপত্র। প্রশাসনের তরফে নথি দেখতে চাওয়া হলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এক ব্যবসায়ী জানান, মাত্র এক মাস আগে তিনি তাঁর দোকানটি চালু করেছেন। সেই কারণে এখনও লাইসেন্স হাতে পাননি। ছোট দোকান হওয়ায় আলাদা করে ট্রেড লাইসেন্স করার কথা তিনি ভাবেননি।
প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, ব্যবসার আকার ছোট হোক কিংবা বড় প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক। যেসব দোকান ও হোটেলে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রেও কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছে। একাধিক হোটেল মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে ও প্রয়োজনীয় নথি না দেখাতে পারা কয়েকটি হোটেল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক দিশা হাজরা জানিয়েছেন, নবদ্বীপ এবং সংলগ্ন এলাকায় আগামী ৪ তারিখ পর্যন্ত এই পরিদর্শন অভিযান চলবে। যাঁদের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নেই, তাঁদের ব্যবসা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এই অভিযানের পিছনে রয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি। কারণ, মায়াপুর শুধু বাংলার মানুষের কাছেই নয়, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মন্দির দর্শনের পাশাপাশি রাস্তার ধারের হোটেল ও রেস্তরাঁগুলিতে খাবার খান। ফলে এই সমস্ত খাবারের দোকানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও নিরাপদ খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।