শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে রবিবার রাত থেকে নানা বিষয় উঠে আসছে। কেউ বলছেন, বোট থেকে সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলেন রাহুল। আবার একটি সূত্রের খবর, সমুদ্রে এগিয়ে যেতেই কোনও ভাবে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। একজন সাঁতার জানা মানুষের এভাবে ডুবে মৃত্যু কিন্তু অনেক সন্দেহ, প্রশ্ন উসকে দিয়েছে।

কিন্তু মর্মান্তিক এই ঘটনার সময়ের যে ফুটেজ পুলিশের হাতে এসেছে, তাতে উঠে আসছে একেবারেই অন্য তথ্য।
রবিবার বিকালে তালসারিতে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ঘটনার আকস্মিকতা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা রাজ্যকে। এভাবে জলজ্যান্ত একটা প্রাণ চলে যেতে পারে, ভাবতেই পারছেন না কেউ।
রাহুলের মৃত্যুর কারণ নিয়ে রবিবার থেকে নানা তথ্য ঘোরাফেরা করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের হাতে যে ফুটেজ এসেছে, তাতে স্পষ্ট হয় বোট উল্টে পড়ে যাওয়ার কোনও বিষয় নেই।
জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, শুটিংয়ের সময়ের যে ফুটেজ আমরা পেয়েছি, তাতে কোনও বোটের উপস্থিতি দেখা যায়নি। দেখা যাচ্ছে ক্যামেরার সামনে অথৈ সমুদ্র। রাহুলরা নিজেরাই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই জল বেড়ে যায়। স্বল্প সময়ের যে ফুটেজ পাওয়া গিয়েছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যা জানিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত এমনটাই জানা গিয়েছে। ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে দাবি, রাহুলের ফুসফুসে অতিরিক্ত বালি ও জল ঢুকে যায়। ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অ্যালকোহলের উপস্থিতি ছিল কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সূত্রের খবর, খাদ্যনালীর ভিতরেও বালি ও নোনা জল ঢুকে গিয়েছিল।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, অল্প সময়ে জলে ডুবে থাকলে এমন ঘটনা ঘটার নয়। কিন্তু প্রোডাকশন টিমের দাবি, রাহুল ডুবে যাওয়ার ৪-৫ মিনিটের মধ্যেই তাঁকে উদ্ধার করা হয়। সেক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে ইউনিটের এই বয়ানেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে।

২৯ মার্চ, বিকাল পাঁচটা নাগাদ ওড়িশার তালসারি সমুদ্রতটে শুটিং চলছিল একটি বাংলা ধারাবাহিকের। পুলিশের হাতে এসেছে সেই শ্যুটিংয়ের ফুটেজ। তাতে দেখা যাচ্ছে রাহুল সহ অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রের হাত ধরে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছেন। হাঁটু জল থেকে আরও গভীরে। আচমকাই দুজনেই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শ্বেতাকে উদ্ধার করা হলেও রাহুল তলিয়ে যান জলের তলায়।
কিন্তু এখানেই শুরু ধোঁয়াশা এবং প্রশ্নের ভিড়। প্রথম প্রশ্ন শ্যুটিংয়ের দৃশ্য আদৌ জলের মধ্যে ছিল কি?
কারণ, পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল জানিয়েছেন, নায়ক নায়িকার জলে শট নেওয়া হচ্ছিল। যদি সত্যিই জলের দৃশ্য না থাকে, তবে ক্যামেরা কেন সেই মুহূর্ত রেকর্ড করছিল? আর যদি শ্যুটিং হচ্ছিল, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
ওই ধারাবাহিকের প্রযোজক সংস্থা-এর কর্ণধার ও লেখিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও প্রায়ই একই বয়ান দিয়েছেন। তাঁর কথায়, দৃশ্যটা ছিল সমুদ্রের পাড়ে। গভীর জলে যাওয়ার কোনও শটই ছিল না। গল্পে দেখানো হচ্ছিল, রাহুল আর শ্বেতা মধুচন্দ্রিমায় এসেছে। শ্যুটিংয়ের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে লীনা গঙ্গোপাধ্য়ায় বলেন, প্রথম দিন তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন এবং সেই নৌকাতেও উঠেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, পরের দিনও একইভাবে চারপাশে একাধিক নৌকা মোতায়েন ছিল।
গোটা ঘটনা সামনে থেকে দেখা, রাহুলের গাড়িচালক বাবলু জানান, রাহুল জলে নামার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। তার কথা, জলের গভীরতা ভালই ছিল। জোয়ার এসেছিল, ভাল স্রোতও ছিল জলের। তার দাবি, রাহুলকে তুলতে অনেকটাই দেরী হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে একটি বড় অসঙ্গতি সামনে এসেছে। একদল বলছেন, শুটিং প্যাকআপের পর রাহুল নিজেই সমুদ্রে নেমেছিলেন। উদ্ধার ও চিকিৎসা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, জল থেকে তোলার সময় রাহুলের জ্ঞান ছিল, এমনকি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসও চলছিল। তা হলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর অবস্থার এমন দ্রুত অবনতি হল কেন? প্রাথমিক চিকিৎসা কি যথাসময়ে এবং সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো আরও জোরাল হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এই মৃত্যু আর নিছক দুর্ঘটনার তত্ত্বে আটকে নেই। বরং একের পর এক অস্পষ্টতা, ফাঁকফোকর আর অমিলের জটিল ছবি সামনে আসছে। শুটিং স্পটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল কিনা, লাইলগার্ড বা জরুরি পরিষেবার উপস্থিতি কেন দেখা যায়নি এবং কেন ইউনিটের সদস্যদের বক্তব্যে এত অমিল এসবই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
ইতিমধ্যেই পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, ময়নাতদন্তের বিস্তারিত রিপোর্টই এই রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তার আগে তালসারির ঢেউ যেন একটাই প্রশ্ন ফিরিয়ে দিচ্ছে-ঠিক কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে থেমে গেল রাহল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন?