শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : ঠিক কোন উদ্দেশ্যে ইরানকে টার্গেট করেছে ইজরায়েল ও আমেরিকার মতো শক্তিশালি দেশ। আর প্রথমে মুখবুজে আঘাত সহ্য করে কিসের জোরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইরান। শুধুই কি হরমুজের আধিপত্য। নাকি রয়েছে আরও বড় কোনও শক্তির ভান্ডার। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে এইরকমই নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে ।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি অনুযায়ী, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল সংঘাতের মূল লক্ষ্য ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং পারমাণবিক ক্ষমতা ধ্বংস করা । মার্কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদৌ-এর মতো প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো অকার্যকর করতে এবং মজুত করা ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে চাপ সৃষ্টি করছে । ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, অভিযানগুলোর মূল লক্ষ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত এবং তা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা । এককথায়, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে, তা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে মজুত ছিল ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম। মার্কিন হামলার পর তা উধাও হয়ে গিয়েছে। এমনই দাবি আমেরিকার। কিন্তু এত কম সময়ে এই বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম কোথায় সরানো হল? যদিও ইজরায়েলের দাবি, ইরানের অন্য কোনও গোপন গবেষণা কেন্দ্রে সরানো হয়েছে ওই বিপুল পরিমাণ তেজষ্ক্রিয় পদার্থ। ইরানের তিন পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ। তবে প্রশ্ন হল, আমেরিকা ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে আক্রমণ চালানোর পরও কেন তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ছড়াল না?ইজরায়েলও ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে আক্রমণ চালিয়েছে। যেভাবে হামলা হয়েছে তাতে মারাত্মক ক্ষতি হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তেহরান অবশ্য গোড়া থেকেই দাবি করে আসছে, এমন কোনও ক্ষতি হয়নি। এতটুকু তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি। আর তাতেই দানা বাঁধে সন্দেহ। আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ,যা পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান, ইসফাহানের আন্ডারগ্রাউন্ড সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত হয়েছে। যদিও ফোরদোর ওপর হামলা হয়েছিল, তবুও ধারণা করা হচ্ছে এর গভীর সুড়ঙ্গে অনেক ইউরেনিয়াম লুকিয়ে রাখা হয়েছে বিশেষজ্ঞদের মতে,ইরানের অত্যন্ত গোপন ও দুর্ভেদ্য পাহাড়ি বাঙ্কারে, বিশেষ করে পিক্স্যাক্স মাউন্টেন এলাকায়, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লুকানো থাকতে পারে ।
ইরানের কাছে ৪০০ কেজিরও বেশি ৬০% হারে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা IAEA এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত দিয়ে দ্রুত ১০টির মতো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব । এই ইউরেনিয়াম ৯০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করলে তা পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী হবে এবং এটি একটি নজিরবিহীন সক্ষমতা। যার দখল করা জন্যই অনেক দিন ধরেই উঠে পড়ে লেগেছে ইজরায়েল ও আমেরিকা।
এবার আসা যাক যুদ্ধে আমেরিকার বর্তমান গতিপ্রকৃতির দিকে। প্রথমে বেশ আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। খার্গ দ্বীপ দখলের কথাও শোনা গেছে। আকাশপথে হামলা চললেও স্থলসেনা পাঠানোর ইঙ্গিতও দেওয়া হয় ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে।হরমুজ প্রণালী সচলে ডেললাইন দেওয়াক মাঝে যুদ্ধ বিরতির কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এককথায় হরমুজ় কাঁটায় পুরোপুরি বিদ্ধ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘরে-বাইরে ঘোর চাপের মুখে পড়েছেন। তার ওপর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়র স্টার্মার সাফ জানিয়েছেন, ইরানে সেনা পাঠানোর কোনও পরিকল্পনা নেই। ।যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার পশ্চিম এশিয়ায় ভিড় জমাচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, খার্গ দ্বীপ দখলে আমেরিকার স্থল সেনা নামলে তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য খুব একটা ফলপ্রসু বিষয় হবে না।এদিকে ট্রাম্পের এই হুমকির মাঝেই পরমানু অস্ত্র প্রসাররোধ চুক্তি তথা নিউক্লিয়ার লল-প্রলিফারেশন টিটি বা NPT থেকে সরে আসার কথা ঘোষনা করেছে ইরান।
এদিকে ইরানকে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের বিভিন্ন বেসামরিক পরিকাঠামোয়, এমনকি জল পরিশ্রুতকরণ কেন্দ্রগুলিতেও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আর এই নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বেসামরিক পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়ে কি যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়বে আমেরিকা? এমন ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে হোয়াইট হাউসকেও। যদিও হোয়াইট হাউসের জবাব, আইন মেনেই পদক্ষেপ করবে মার্কিন বাহিনী।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইজরায়েলে রকেট হামলা বাড়িয়েছে।এদিকে ট্রাম্প আলোচনার কথা বলার মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সেনা পাঠাচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ। তাঁর অভিযোগ, একদিকে ওয়াশিংটন আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। স্থল অভিযান হলে ইরানও প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাঘের গালিবাফ। তাঁর ভাষায়, তাঁদের ভূখণ্ডে নামলে মার্কিন সেনারা ‘বৃষ্টির মতো’ গুলিবর্ষণের শিকার হবেন।
তবে ইরান যদি সত্যি ১০টির মতো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলে তাহলে পশ্চিম এশিয়ার য়ুদ্ধে পরিস্থিতি আদৌ করে নিয়ন্ত্রনে আসবে , তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। কেননা ইতিহাস সাক্ষী আছে যুদ্ধের স্থায়ীত্ব ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করে বিশ্বের একাধিক দেশে। ফের কি কোনও বিশ্বযুদ্ধের সম্মুক্ষিন হতে হবে বর্তমান বিশ্বকে। আতঙ্কে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।