রিয়া দাস, সাংবাদিক : বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়তেই চায় না ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তিনি যাই করেন তাই বিতর্কের আকার ধারণ করে। তিনি হতো এই ভাবেই খবরের শিরোনামে থাকতে চান। তাই বলাই যায় বিতর্ক আর ট্রাম্প দুজনেই একে অপরের পরিপূরক। কিছুদিন আগেই ভারত এবং চিনকে হেলহোল বলার জন্য তাঁকে নানান সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এবার আরও একটি কাণ্ড ঘটালেন। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তা। আর তার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। সম্প্রতি তিনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ স্যোশাল-এ একটি মানচিত্র পোস্ট করে এই প্রণালীর নামই বদলে দিয়েছেন। নাম বদলে করেছেন ট্রাম্প প্রণালী। তাঁর এই পোস্ট আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ঝড় তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি নিছক প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এর সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিত।

ঘটনার সূত্রপাত ‘আইস্ট্যান্ডউইথট্রাম্প৪৭’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে যেখানে প্রথম এই পরিবর্তিত মানচিত্রটি প্রকাশিত হয়। পরে সেটিকেই নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন ট্রাম্প। যদিও মানচিত্রে নাম পরিবর্তনের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল তবু কোনো ব্যাখ্যামূলক ক্যাপশন দেননি তিনি। আর এই নীরবতাই যেন আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই নিয়েই শুরু হয়েছে চর্চা। প্রশ্ন উঠেছে এইভাবেই কি ট্রাম্প জোর করে প্রণালী দখলের বার্তা দিলেন। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রচারের কৌশল হলেও অন্যরা এটিকে দেখছে শক্তির প্রকাশের বার্তা হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে হরমুজ প্রণালীর উপর তাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সেই দাবির পক্ষে তারা পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছে। ৪২টি জাহাজকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের প্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে ইরান বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলেও দাবি ওয়াশিংটনের। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বহু জাহাজ এই অবরোধ ভেঙে বেরিয়েও যাচ্ছে যা প্রমাণ করে যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি প্রশ্নসাপেক্ষ।
অন্যদিকে ইরানও নীরব দর্শকের ভূমিকায় নেই। আমেরিকার কাছে হার মানতে নারাজ। আমেরিকা যতই কড়া বার্তা দিক না কেন ইরান ভয় পেয়ে থেমে থাকেনি। বরং তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে ক্রমাগত কড়া বার্তা দিচ্ছে যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ঝড়় আসছে। এই সতর্কবার্তা গোটা বিশ্বকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি পকিস্তান ও ওমান সফর করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতেই তেহরান থেকে তিন দফা প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে আমেরিকার কাছে যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির রূপরেখা তৈরি করা। তবে এই প্রস্তাবের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও জুড়ে দিয়েছে ইরান। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করছে ততক্ষণ তারা কোনও পরমাণু সংক্রান্ত আলোচনায় বসতে রাজি নয়। যদিও ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব নিয়ে মুখ খোলেনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একাংশ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাব মেনে নিতে আগ্রহী নয়। এই জটিল পরিস্থিতির মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। আসলে হরমুজ প্রণালীর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? এটি কি সত্যিই আমেরিকার শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র নাকি ইরানের কৌশলগত প্রতিরোধের এক শক্তিশালী মঞ্চ? এই প্রণালী শুধুমাত্র একটি জলপথ নয় এটি বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী। যেখানে প্রতিটি কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রতিফলিত হয় বিশ্ববাজারে। ট্রাম্প প্রণালী নামটি হয়তো সাময়িক আলোচনার বিষয়। কিন্তু তার আড়ালে যে সংঘাতের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে, তা যদি সময়তমতো প্রশমিত না হয় তবে সেই ঝড়ের অভিঘাত ছ়ড়িয়ে পড়তে পারে গোট বিশ্বজুড়ে।