অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : বদলে গেল বাংলার ক্ষমতার করিডরের রং। সবুজ পেরিয়ে এবার নবান্নে গেরুয়ার দাপট। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী সমীকরণ আর পরিবর্তনের স্লোগানকে সামনে রেখে অবশেষে বাংলায় সরকার গড়ল বিজেপি। আর সেই ঐতিহাসিক পালাবদলের মুখ হয়ে প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্ব হাতে নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শপথের আবেগ কাটতে না কাটতেই কর্মসংস্কৃতির জোয়ারে নতুন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথম দিন থেকেই প্রশাসনিক গতি বাড়িয়ে সোনার বাংলার রোডম্যাপ স্পষ্ট করতে চাইছে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। বাম ও তৃণমূলের পর এবার পদ্ম-যুগের সূচনা হলো রাইটার্স-নবান্নে। শপথ গ্রহণের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রশাসনিক কাজে কোমর বেঁধে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শাসন নয়, সেবা, এই মন্ত্রকে সামনে রেখেই পথ চলা শুরু বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই প্রশাসনিক তৎপরতায় চমক দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। কোনো রকম সময় নষ্ট না করে সোমবারই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক । সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এদিনই প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক মুখ্যমন্ত্রীর। রাজনৈতিক মহলের মতে, আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতেই এই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্জারি।
সোমবার সকাল সাড়ে নটা নাগাদ চিনার পার্কের বাড়ি থেকে বের হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। চিনার পার্কের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় ছোটে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বাড়ির দিকে।
মুখ্যমমন্ত্রীর কনভয় পৌঁছয় রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বাড়ি। ফুলমালায় তাঁকে স্বাগত জানান স্থানীয়রা। উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কর্মী সমর্থকরা।
এরপর শমীককে সঙ্গে নিয়ে একই গাড়িতে রাজ্য বিজেপি কার্যালয়ে যান শুভেন্দু। তাঁকে স্বাগত জানাতে সেজে ওঠে সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়। ফুল, বরণডালায় রাজ্য বিজেপি দফতরে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। ২০৭টি পদ্মের মালায় তাঁকে বরণ করা হয়। কুলো হাতে শুভেন্দুকে অভ্যর্থনা জানান মহিলারা। এখানে একপ্রস্থ সাংগঠনিক বৈঠক সারেন শুভেন্দু। সেখান থেকে নবান্নে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গার্ড অফ অনার দেওয়া হয় তাঁকে। বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ইনিংস শুরু শুভেন্দু অধিকারীর।

১৪ তলায় নিজের দপ্তরে পৌঁছন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই সাংবাদিক বৈঠক করেন তিনি। এদিন মন্ত্রিসভার ৬ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
১. শহিদ বিজেপে কর্মীদের পরিবারের দায়িত্ব নিল সরকার
২. সীমান্তে কাঁটাতারের জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি
৩. আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে যুক্ত বাংলা
৪. বিশ্বকর্মা যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পে সামিল বাংলা
৫. রাজ্যে কার্যকর ভারতীয় ন্যায় সংহিতা
৬. ৫ বছর বাড়ল সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনের সময়সীমা
২০১৫ সালের পর থেকে রাজ্যে বড় মাপের কোনও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। এর ওপর পূর্বতন সরকারের আমলে নিয়োগ দুর্নীতির জেরে হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। দিনের পর দিন আইনি লড়াই এবং রাজপথে আন্দোলনের ফলে অনেক প্রার্থীরই সরকারি চাকরিতে বসার নির্ধারিত বয়স পেরিয়ে গিয়েছিল। এই ‘বয়স ফুরিয়ে যাওয়া’ প্রার্থীদের কথা চিন্তা করেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা ক্ষমতায় আসার আগেই বলে রেখেছিল বিজেপি। এবার তাতে সিলমোহর দিল বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের এই পদক্ষেপে খুশির হাওয়া চাকরিপ্রার্থীদের মহলে।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে বদ্ধপরিকর রাজ্য সরকার। প্রথম বৈঠকে সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যে কয়েকটি পূরণ করার সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয় বৈঠকে নারী নির্যাতন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, পে কমিশন, মহার্ঘ ভাষা-সহ আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান শুভেন্দু। জানান, প্রথম বৈঠকেই এই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি কারণ, সরকার গঠনের পরে খুব বেশি সময় পাওয়া যায়নি। আপাতত যে কাগজগুলি তৈরি ছিল সেই বিষয়েই প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার চোখ পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে।
গার্ড অফ অনার থেকে প্রথম ক্যাবিনেট। সবেতেই ছিল নতুন সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বার্তা। বিরোধী রাজনীতি থেকে প্রশাসনের কেন্দ্রে উঠে এসে প্রথম দিনেই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা শুভেন্দু অধিকারীর। চাকরিপ্রার্থীদের বয়স সীমায় ছাড়, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাংলাকে সামিল করা থেকে শুরু করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কড়া অবস্থান। সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই প্রশাসনিক রোডম্যাপ স্পষ্ট করতে চাইল নতুন সরকার। তবে শপথের উচ্ছ্বাস কাটতেই এবার শুরু আসল পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিকে সামনে রেখে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ফলে প্রত্যাশার চাপও এখন অনেক বেশি। প্রতিশ্রুত সোনার বাংলা কতটা বাস্তবের মাটিতে নামানো যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যবাসীর। আর সেই লক্ষ্যেই প্রথম দিন থেকেই অ্যাকশন মোডে বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।