সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : দেশ জুড়ে যখন নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ড নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে, একের পর এক গ্রেফতারি হচ্ছে, তখনই সামনে এল আরও এক বিস্ফোরক অভিযোগ। এ বার সরাসরি এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে উঠল প্রশ্নপত্র ফাঁসের টোপ দেখিয়ে ছাত্রীকে হেনস্থার অভিযোগ। “ডার্লিং, তোমার জন্য দুটো প্রশ্নপত্র জোগাড় করে রেখেছি”- শিক্ষকের মুখে এই কথা শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে যান ওই ছাত্রী। কিন্তু সেখানেই থামেননি অধ্যাপক। বাড়িতে এসে দেখা করার জন্য বারবার চাপ দিতে থাকেন। আর সেই কথোপকথনই গোপনে রেকর্ড করে পুলিশের হাতে তুলে দেন ছাত্রী। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে উত্তরপ্রদেশের লফনউ বিশ্ববিদ্যালয়-তে।

অভিযুক্ত অধ্যাপকের নাম পরমজিৎ সিংহ। অভিযোগ, তিনি এক ছাত্রীকে পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করতেন। ছাত্রীর দাবি, অধ্যাপক বারবার বলতেন তাঁর কাছে প্রশ্ন আছে এবং সেটা নেওয়ার জন্য বাড়িতে যেতে হবে। প্রকাশ্যে আসা অডিয়ো ক্লিপে শোনা যাচ্ছে—
“বাড়িতে এসে এক বার দেখা করতে পারবে?”
ছাত্রী জিজ্ঞাসা করছেন- “কেন স্যর?”
তার উত্তরে অধ্যাপক বলছেন- “তোমার জন্য দুটো প্রশ্নপত্র জোগাড় করে রেখেছি, ডার্লিং! কখন আসতে পারবে?”
ছাত্রী উত্তর দেন- “স্যর, আমি পুরো সিলেবাস শেষ করে ফেলেছি। আরও কিছু বিষয় ঝালিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেগুলিই করছি। তবে আমি আসার চেষ্টা করব।”
তার পরেই অধ্যাপক বলেন- “চেষ্টা নয়, পরীক্ষার আগেই এসো কিন্তু। অবশ্যই সাত দিনের মধ্যে।”
এই কথোপকথন সামনে আসতেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও ওই অডিয়োর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি, তবে ছাত্রী সেটি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্ত অধ্যাপক পরমজিৎ সিংহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জেরে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে। কিন্তু তদন্তকারীরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কারণ এই ঘটনায় শুধু যৌন হেনস্থার অভিযোগ নয়, প্রশ্নফাঁসের সম্ভাবনাও জড়িয়ে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জেপি সৈনি গোটা ঘটনার অন্তর্তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন কোনও কাজ বরদাস্ত করা হবে না। যদি অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই ঘটনার সময়টা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ঠিক এর আগেই দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে NEET UG 2026 paper leak controversy। গত ৩ মে নিট পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু ৭ মে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। তারপর ১২ মে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে National Testing Agency বা এনটিএ। আর সেই দিনই তদন্তভার হাতে নেয় Central Bureau of Investigation।
সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য। মহারাষ্ট্রের লাতুরের বাসিন্দা অধ্যাপক পিভি কুলকার্নির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিই নাকি গোটা প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল মাথা। তদন্তকারীদের দাবি, প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত ছিলেন পুণের এক কলেজের এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। সেই সূত্রেই পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র তাঁর হাতে পৌঁছে যায় বলে সন্দেহ। তদন্তে জানা গিয়েছে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়েছিল এই গোটা অপারেশন। প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর কুলকার্নি তাঁর সহযোগী মনীষা ওয়াঘমারেকে নিয়ে কয়েকজন নিট পরীক্ষার্থীকে জোগাড় করেন। তারপর নিজের বাড়িতেই গোপনে চলত কোচিং ক্লাস।
পড়শিদের দাবি, তাঁরা প্রায়ই দেখতেন বহু ছাত্রছাত্রী ব্যাগ নিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকছে। কিন্তু ভিতরে ঠিক কী চলত, তা কেউ বুঝতে পারেননি। এখন প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে অধ্যাপকের নাম জড়িয়ে পড়তেই হতবাক স্থানীয়রা। তাঁদের অনেকের কথায়- “বিশ্বাসই করতে পারছি না, শিক্ষকের বাড়িতে এ ভাবে দুর্নীতির কারখানা চলতে পারে!” সিবিআই সূত্রে খবর, পরীক্ষার্থীদের কোনও ছাপানো বা ডিজিটাল প্রশ্নপত্র দেওয়া হত না। বরং অধ্যাপক মুখে মুখে প্রশ্ন বলতেন। ছাত্রছাত্রীরা তা খাতায় লিখে নিত। মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের সঠিক উত্তরও বলে দেওয়া হত। নির্দেশ ছিল- কোনও মোবাইল নয়, কোনও ফোটোকপি নয়, সব কিছু হাতে লিখে রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে হাতে লেখা প্রশ্নপত্র পরে উদ্ধার হয়েছে, তার হাতের লেখার সঙ্গে ওই বিশেষ ক্লাসে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের খাতার মিল পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। এই মামলায় ইতিমধ্যেই একাধিক রাজ্যে গ্রেফতারি হয়েছে। রাজস্থানের সীকর, মহারাষ্ট্রের নাসিক, হরিয়ানা-সহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল প্রশ্নফাঁসের জাল। সিবিআই ইতিমধ্যেই সাত জনকে গ্রেফতার করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কুলকার্নির সহযোগী মনীষাও। এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, তাঁর সহযোগী এবং আরও কয়েকজন অভিযুক্ত।
এই ঘটনাগুলি সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। আর সেখানে যদি প্রশ্নফাঁস চক্র সক্রিয় থাকে, তাহলে মেধাবী পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে? শুধু তাই নয়, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যখন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যৌন হেনস্থার অভিযোগ ওঠে, তখন গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার উপরই আস্থা নষ্ট হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ সামনে এলেই দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা তাই শুধুমাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়। এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার নিরাপত্তা এবং শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার, তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কতটা কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়।