অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : রেশন দুর্নীতির পর এবার সামনে আসছে আরও বড় কেলেঙ্কারির অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু বীরভূমে। বছরের পর বছর ধরে সরকারি রাজস্বে কোটি কোটি টাকার গরমিল। বেআইনি খাদান, আর বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে চেক গেট পরিচালনার আড়ালে চলেছে বিশাল দুর্নীতির কারবার। মহম্মদবাজার থেকে ময়ূরেশ্বর, নলহাটি, রামপুরহাট, মুরারই। বিস্ফোরক দাবি উঠছে জেলার একাধিক এলাকা জুড়ে। সরকারি ব্যবস্থার বাইরে থেকেই চলত এই পুরো প্রক্রিয়া। রাজ্যে পালাবদলের পর বেআইনি কারবারে কড়া নজরদারি। তারপর থেকেই একের পর এক উঠে আসতে শুরু করেছে রাজস্ব ফাঁকি এবং দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৬ সালের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ হতেই বাংলায় বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। রাজ্যজুড়ে গেরুয়া শিবিরের কর্মীদের মধ্যে যখন জয়ের আনন্দ তুঙ্গে, ঠিক তখনই এক অন্যরকম দায়িত্বশীলতার ছবি দেখা গেল বীরভূমের সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে। জয়ের উন্মাদনায় ভেসে না গিয়ে, রীতিমতো অ্যাকশন মুডে ধরা দেন নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ডিসিআর পরিচালনার আড়ালে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুঠ হয়েছে। সেই অঙ্ক ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
১৭ মে থেকে সরকারিভাবে রাজস্ব আদায় শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই ৯টি চেক গেট থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। দ্বিতীয় দিনে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। যা হিসেব করে দেখলে মাসে প্রায় ৭০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। মহম্মদবাজার, রামপুরহাট, ময়ূরেশ্বর, নলহাটি ও মুরারই এলাকায় এই চেক গেটগুলি চালু হয়েছে। তার পরেই স্পষ্ট হয় তৃণমূলের আমলে কেলেঙ্কারির ছবিটা। এরপরই অতীতের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রশ্ন তোলেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১৯ লক্ষ টাকা রাজস্ব জমা পড়ত। পরে নভেম্বর ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তা বেড়ে দৈনিক ৭০ লক্ষ টাকায় পৌঁছয়। কিন্তু এখন সরকারি তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হতেই কয়েক দিনের মধ্যেই আয়ের অঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এতদিন পরিকল্পিতভাবে বিপুল রাজস্ব চুরি হয়েছে। এদিন তিনি আরও জানান, মুখ্যমন্ত্রীর তরফে সম্প্রতি রাজস্ব আদায় নিয়ে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বৈধ ডিসিআর ছাড়া কোনও পাথরবোঝাই গাড়ি ধরা পড়লে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্পট ফাইন করা হবে, প্রয়োজনে গাড়ি বাজেয়াপ্তও করা হবে।
পুরো বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিও তুলেছেন সিউড়ির বিজেপি বিধায়ক। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনায় যদি কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মী বা বেসরকারি সংস্থার যোগসূত্র থাকে, তাহলে কাউকেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বীরভূমের পাথর শিল্পকে ঘিরে এতদিন যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল, এবার সেই অভিযোগই যেন আরও জোরালোভাবে সামনে এনে দিল রাজস্ব আদায়ের এই বিপুল ফারাক। সরকারি তত্ত্বাবধানে মাত্র দুদিনে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব জমা পড়তেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এতদিন তাহলে কত টাকা সরকারের কোষাগারে না গিয়ে অন্য পথে গিয়েছে? বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের একাংশ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং বেসরকারি সংস্থার যোগসাজশেই চলেছে এই কারবার। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল।
তবে পালাবদলের পর এখন কড়া নজরদারির বার্তা প্রশাসনের। বেআইনি খাদান, ভুয়ো ডিসিআর এবং রাজস্ব ফাঁকি রুখতেই একের পর এক পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে দাবি সরকারের। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন সিউড়ির বিজেপি বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর দাবি, এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকেই রেয়াত করা উচিত নয়। এখন দেখার, তদন্তে সামনে আসে ঠিক কত বড় দুর্নীতির চিত্র।