মাম্পি রায়, সাংবাদিক : ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ আর ‘মিম’-এর দুনিয়া পেরিয়ে এবার কার্যত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অনলাইন-ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে ১ কোটি অনুসারীর গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার ময়দানে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপিকেও পিছনে ফেলেছে তারা।

‘@cockroachjantaparty’ নামে পরিচালিত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি বৃহস্পতিবার ১ কোটি ফলোয়ারের মাইলফলক স্পর্শ করে। তুলনায় বিজেপির সরকারি অ্যাকাউন্ট ‘@bjp4india’-র ফলোয়ার প্রায় ৮৭ লক্ষ। যদিও কংগ্রেসের ‘@incindia’ এখনও এগিয়ে, তাদের ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩২ লক্ষ। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত আম আদমি পার্টির (Aam Aadmi Party) ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ১৯ লক্ষ।
এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Surya Kant) একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ১৫ মে এক শুনানিতে তিনি তরুণদের একাংশকে ‘আরশোলার মতো’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কিছু যুবক কর্মসংস্থান না পেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া, আরটিআই কর্মসূচি বা সমাজকর্মের আড়ালে অন্যদের আক্রমণ করে বেড়ায়। সেই মন্তব্য ঘিরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় নেটমাধ্যমে।
পরের দিনই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র আত্মপ্রকাশ। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক জানান, প্রধান বিচারপতির মতো সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আরও বেশি আঘাত দিয়েছে তরুণ সমাজকে। তাঁর কথায়, “যিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবেন, তিনিই আমাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করছেন—এটাই সবচেয়ে কষ্টের।”
ক্রমশ এই অনলাইন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন পরিচিত মুখও। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি (Dhruv Rathee), আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ (Prashant Bhushan), তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra) এবং কীর্তি আজাদেক (Kirti Azad) মতো ব্যক্তিত্বরা ককরোচ জনতা পার্টিকে সমর্থন জানিয়েছেন। প্রশান্ত ভূষণ ইতিমধ্যেই ‘নিট’ প্রশ্নফাঁস এবং কর্মসংস্থানের অধিকার নিয়ে সরব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা এবং বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠন এক জিনিস নয়। অনলাইনে কোটি ফলোয়ার থাকলেই তা ভোটের ময়দানে প্রভাব ফেলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু ব্যঙ্গ ও ক্ষোভকে হাতিয়ার করে যে নতুন প্রজন্মের একটা অংশ নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে চাইছে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র উত্থান সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
প্রত্যেক মিনিটে হুহু করে বাড়ছে ককরোচ জনতা পার্টির। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার পরিসংখ্যান বলছে, ১২.৮ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে এই সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের। আত্মপ্রকাশের মাত্র পাঁচদিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে বিজেপির ফলোয়ার সংখ্যা টপকে গিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। বর্তমানে শাসক দল বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ৮.৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৮৭ লক্ষ। তার চেয়ে বেশি ফলোয়ার রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির। আপাতত ১ কোটি ২৮ লক্ষ ফলোয়ার রয়েছে তাদের। কংগ্রের ইনস্টাগ্রামে ১৩.২ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে, অর্থাৎ ১ কোটিরও বেশি। তাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে ককরোচ জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা।
এই সাফল্যের পর ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠতা অভিজিৎ দীপক। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তাঁর কটাক্ষ, ‘বিজেপি নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম পার্টি হিসাবে দাবি করে। কিন্তু ওদের টপকে যেতে আমাদের মাত্র চারদিন লাগল। দেশের যুবশক্তির ক্ষমতাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।’ এই পোস্ট করার কয়েকঘণ্টার মধ্যেই দেখা যায়, এক্স থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির অফিসিয়াল হ্যান্ডেল। বলা হচ্ছে, আইনি কারণে ভারতে এই অ্যাকাউন্টটি আপাতত সাসপেন্ড রাখা হয়েছে।
এক্স অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড হওয়ার পরেই ইনস্টাগ্রামে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অভিজিৎ। তাঁর প্রশ্ন, কেন সরিয়ে দেওয়া হল এই অ্যাকাউন্ট? এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনও অন্যায় মন্তব্য করা হয়নি, উসকানিমূলক পোস্টও করা হয়নি। তা সত্বেও কেনঅ্যাকাউন্ট বন্ধ করে যুবসমাজের মুখ বন্ধের চেষ্টা চলছে?