সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভাবুন তো- আপনার মোবাইলে আপনি লাইভ টিভি দেখছেন, খবর দেখছেন, এমনকি ম্যাচও দেখছেন, কিন্তু একটুও ডেটা খরচ হচ্ছে না! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, খুব শিগগিরই এটা বাস্তব হতে চলেছে ভারতে। কারণ একদিকে আসছে নতুন D2M প্রযুক্তি, আর অন্যদিকে Telecom Regulatory Authority of India-এর বড় সিদ্ধান্ত- ডেটা ছাড়া সস্তা রিচার্জ প্ল্যান। এখন প্রশ্ন- এই দুই বড় পরিবর্তন কীভাবে আপনার মোবাইল ব্যবহার, খরচ এবং পুরো টেলিকম ইন্ডাস্ট্রিকেই বদলে দিতে পারে।
প্রথমেই আসি D2M প্রযুক্তিতে। D2M বা Direct-to-Mobile প্রযুক্তি কী?
সহজ করে বললে, এটা এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে মোবাইলে ভিডিও, টিভি, অডিও- সবকিছু সরাসরি ব্রডকাস্ট হয়ে আসবে, একেবারে FM রেডিওর মতো। এখানে ইন্টারনেটের দরকার নেই, ডেটা প্যাকের দরকার নেই। মানে- ইউটিউব বা OTT নয়, সরাসরি সিগন্যাল, কোনও বাফারিং নেই, নেট স্লো হলেও সমস্যা নেই।

এখন প্রশ্ন- এটা কীভাবে সম্ভব?
D2M কাজ করে টেরেস্ট্রিয়াল ব্রডকাস্ট সিগন্যালের মাধ্যমে। ঠিক যেভাবে টিভিতে অ্যান্টেনা দিয়ে চ্যানেল ধরা হত, সেই ধারণাটাকেই মোবাইলে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে Saankhya Labs, যা Tata Group-এর অংশ। আর খুব শিগগিরই HMD Global ও Lava International D2M-enabled ফোন বাজারে আনতে পারে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
প্রথমত, ডেটা ছাড়াই ভিডিও দেখা যাবে। দ্বিতীয়ত, নেটওয়ার্ক জ্যাম হলেও কোনও সমস্যা হবে না। তৃতীয়ত, সরকার সরাসরি জরুরি বার্তা পাঠাতে পারবে- even যখন ইন্টারনেট বন্ধ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই প্রযুক্তি গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য গেমচেঞ্জার হতে পারে। ভারতে এখনও ৮-৯ কোটি পরিবার আছে যাদের টিভি নেই, আর ২০ কোটির বেশি মানুষ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। তাদের জন্য D2M মানে- ফ্রি বিনোদন, শিক্ষামূলক কনটেন্ট, খবরের সহজ অ্যাক্সেস।
এবার আসি টেলিকম কোম্পানিগুলোর প্রসঙ্গে- Reliance Jio, Bharti Airtel এবং Vodafone Idea- এই তিন বড় প্লেয়ারের জন্য D2M একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ।
পজিটিভ দিক-
বর্তমানে মোবাইল ডেটার ৮০% ব্যবহারই ভিডিও দেখার জন্য
D2M এলে এই ভিডিও ট্রাফিকের ২৫–৩০% কমে যেতে পারে
ফলে- নেটওয়ার্কে চাপ কমবে
5G আপগ্রেডে খরচ কমবে
নেগেটিভ দিক–
যদি মানুষ ডেটা ছাড়া ভিডিও দেখতে পারে, তাহলে ডেটা রিচার্জ কমে যেতে পারে
মানে কোম্পানির আয় বা ARPU কমার সম্ভাবনা
তবে নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে- টেলিকম কোম্পানিগুলো কনটেন্ট কোম্পানির সঙ্গে পার্টনারশিপ করে নতুন সার্ভিস চালু করতে পারে। এবার আসি আরেকটা বড় খবরে- Telecom Regulatory Authority of India বা TRAI নিয়ে এসেছে এক যুগান্তকারী প্রস্তাব। এই প্রস্তাব কী? এখনকার দিনে আমরা দেখছি-
রিচার্জ মানেই ডেটা + কল + SMS
ডেটা না লাগলেও ডেটা কিনতেই হচ্ছে
এই “forced data recharge” বন্ধ করতে চাইছে TRAI। নতুন নিয়ম অনুযায়ী- প্রতিটি validity- 28 দিন, 56 দিন, 84 দিন- এর জন্য। আলাদা করে শুধুমাত্র Voice + SMS প্ল্যান দিতে হবে। মানে যদি আপনি শুধু কথা বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহার না করেন- আপনার জন্য আলাদা সস্তা প্ল্যান থাকবে, অযথা ডেটার জন্য টাকা দিতে হবে না। সবচেয়ে বড় সুবিধা কারা পাবে? প্রবীণ মানুষ, গ্রামাঞ্চলের ব্যবহারকারী, ফিচার ফোন ইউজাররা। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- এই ডেটা-ফ্রি প্ল্যানের দাম কমাতে হবে কোম্পানিগুলোকে। মানে বর্তমান কম্বো প্ল্যানের তুলনায় অনেক কম খরচ হবে।
ধরা যাক- এখন আপনি ২৮ দিনের জন্য 250–300 টাকা খরচ করছেন। কিন্তু নতুন নিয়মে সেটা নেমে আসতে পারে 100–150 টাকায়।
এছাড়া TRAI বলেছে- এই প্ল্যানগুলো স্পষ্টভাবে ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও দোকানে দেখাতে হবে। যাতে গ্রাহক সহজে বেছে নিতে পারেন- এই প্রস্তাব নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে 28 এপ্রিল 2026 পর্যন্ত। তারপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন প্রশ্ন- এই দুই পরিবর্তন একসঙ্গে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? একদিকে D2M বলছে- ডেটা ছাড়াই ভিডিও অন্যদিকে TRAI বলছে- ডেটা ছাড়া রিচার্জ। মানে ভবিষ্যতে মোবাইল ব্যবহার পুরো বদলে যেতে পারে। আগে যেখানে- ডেটা ছিল বাধ্যতামূলক। সেখানে এখন- ডেটা হয়ে যেতে পারে অপশনাল।
সবশেষে বলা যায়- এই পরিবর্তন শুধু টেলিকম সেক্টর নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবন, খরচ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন- সবকিছুকে বদলে দিতে চলেছে। আপনার মোবাইল বিল কমতে পারে, আর বিনোদন হতে পারে আরও সহজ, সস্তা এবং সবার জন্য গ্রহনযোগ্য। এখন শুধু দেখার- এই পরিবর্তন কত দ্রুত বাস্তবে আসে, আর এই নতুন ডিজিটাল বিপ্লব থেকে আপনি কতটা লাভবান হন।