বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ক্রমশ বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ। ন্যূনতম মাসিক বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পথে নেমেছেন হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক। আর সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের একাধিক শিল্পাঞ্চল। রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে গাজীপুর, সাভার এবং আশুলিয়া। বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, পথ অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গাজীপুরের একাধিক এলাকায়। শ্রমিকদের বিক্ষোভ সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে আন্দোলনকারীদের একাংশের বিরুদ্ধে। সংঘর্ষে পুলিশকর্মী ও শ্রমিক-সহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতির জেরে গাজীপুরের অন্তত ৬০টি পোশাক কারখানায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাকশ্রমিকেরা। নাওজোড়, ভোগড়া, মৌচাক এবং পল্লিবিদ্যুৎ-সহ একাধিক এলাকায় শ্রমিকদের জমায়েত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন কারখানা থেকে কাজ ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন শ্রমিকেরা। একসময় ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় সড়কে অবরোধ শুরু হয়। এর ফলে দুই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে যান চলাচল কার্যত থমকে যায়। দূরপাল্লার বাস-সহ একাধিক যানবাহন দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়ে। রাস্তার উপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং বাঁশ ফেলে বিক্ষোভ দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় শিল্প পুলিশ, মহানগর পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ভোগড়া এলাকায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। ইটের আঘাতে কয়েক জন পুলিশকর্মী আহত হন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। কোথাও কোথাও লাঠিচার্জও করা হয়। পাল্টা বিক্ষোভকারীদের একাংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে ড্রোনের সাহায্য নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুপুরের পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। অন্যদিকে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ ফের যান চলাচল শুরু হয়।
শুধু গাজীপুর নয়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরেও শ্রমিক অসন্তোষের আঁচ ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার সকালেও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভে যোগ দেন পোশাকশ্রমিকদের একাংশ। মিরপুর-১০, মিরপুর-১২ এবং নান্না মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের জমায়েত বাড়তে থাকে। কোথাও কাঠের আসবাব জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান তাঁরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। কয়েক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে বলে খবর।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদর, বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা এবং যাতায়াতের খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বেতন বাড়াতে হবে। সেই কারণেই মাসিক ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি তুলেছেন তাঁরা। গত কয়েক দিন ধরেই এই দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন চলছে। রবিবার ও সোমবারও মিরপুর, গাজীপুর, সাভার এবং আশুলিয়ার একাধিক এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। কোথাও জাতীয় সড়ক অবরোধ, কোথাও কারখানার সামনে বিক্ষোভ, আবার কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের জেরে একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই উদ্যোগী হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন। গত ১ নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানানো হয়। শ্রমিক, মালিকপক্ষ, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে এই বোর্ড কাজ করবে। ২ নভেম্বর পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে, শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছে সরকার। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের পরেও আন্দোলন থামেনি। বরং মঙ্গলবারও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। গাজীপুরে ৬০টি কারখানা বন্ধ রাখার পাশাপাশি সোমবার, ওই জেলার ১৫০টিরও বেশি কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
শ্রমিকদের আন্দোলন চতুর্থ দিনেও অব্যাহত ছিল। মজুরি বোর্ড গঠিত হলেও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবির বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি। গাজীপুরে সংঘর্ষের পর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। ফলে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে প্রশাসন। এখন দেখার, আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি কতটা মেনে নেওয়া সম্ভব হয়, নাকি আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনের মুখে পড়তে হয় বাংলাদেশকে।