জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ২০০৩ সালে তৎকালীন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বে বিশ্বাকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল ভারত। একশো কোটি দেশবাসী স্বপ্ন দেখেছিল সেদিন। অস্ট্রেলিয়া ৩৫৯ রানের জবাবে যখন ভারতের একের পর এক ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন একটা স্লোগান শোনা গিয়েছিল, হালের কাছে সচিন ছিল, করবে তরি পার। কিন্তু না, একশো কোটি দেশবাসীর স্বপ্ন সেদিন ভঙ্গ হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার ৩৫৯ রানের জবাবে মাত্র ৩৯.২ ওভারে ২৩৪ রানে শেষ হয়েছিল ভারতের ইনিংস। ১২৫ রানে ভারতকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল পন্টিং-এর অস্ট্রেলিয়া। আমার এত সময়ের কথা শুনে আপনার মনে হতে পারে হঠাৎ কেন আমি ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের কথা বলছি আপনাদের। একটু ধৈর্য্য ধরুন বলছি। রবিবার ছিল এশিয়া কাপের ফাইনাল। যেটা আমরা প্রত্যকেই জানি। সেখানে ঠিক কতটা রোমহর্ষক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বেশ কিছু টুকরো ঘটনার মধ্যে দিয়ে আরও একবার চলুন স্মরণ করা যাক।

শুভমন গিলের ক্যাচটা মিড-অনে হ্যারিস রউফের তালুবন্দি হওয়ার পরে দুবাই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে শ্মশানের নিরবতা নেমে এসেছিল। হতাশ ভারতীয় সমর্থকদের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, এবারেও তীরে এসে তরী ডুববে না তো। কারন ২০ রানের মধ্যে ভারত তিনটি উইকেট হারিয়েছিল। তখন হাল ধরেন সঞ্জু স্যামসন ও তিলক বর্মা। যদিও জয়সূচক রান আসে রিঙ্কু সিংয়ের ব্যাট থেকে। এটা বলে রাখা দরকার এশিয়া কাপে রবিবারই প্রথম ম্যাচ খেলেছিলেন রিঙ্কু। টানা তৃতীয় বার পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জিতে নিল ভারত। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় খেলোয়াড়রা দেখিয়ে দিলেন এভাবেও ফিরে আসা যায়।
এবার আসি বিতর্কের মুহূর্তে। নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখতে গেলে এ বারের এশিয়া কাপ বিতর্কিত। একে তো পলেওগাঁও কান্ড ও অপারেশন সিঁদুরের পর দুই দল প্রথম খেলছে। দুই দলের ক্রিকেটারদের একাধিক অঙ্গভঙ্গিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সূর্যকুমার যাদব ও হ্যারিস রউফকে জরিমানা করা হয়েছে। প্রথম থেকেই একটা কানাঘুসো শোনা যাচ্ছিল, ভারত এশিয়া কাপ জিতলে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি নেবেন না সূর্যকুমার যাদবরা। সেই জল্পনাই সত্যি হয়, পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ভারতের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি নেবেন না সূর্যকুমার যাদবরা। এমনকি রবিবার জেতার পরে ভারতীয় কোনও খেলোয়াড়ই গলায় চ্যাম্পিয়ন মেডেল পরেননি। তবে অভিষেক শর্মা এবং তিলক ভার্মা প্লেয়ার অফ দ্য সিরিজ এবং প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্টের পুরষ্কার গ্রহণ করেছিলেন। ভারতীয় দলের কাছ থেকে এই কথা শোনার পরে দেখা যায় মহসিন নকভি, আমিরাত ক্রিকেট বোর্ডের সহ-সভাপতি খালিদ আল জারুনি-সহ মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্ট জনেরা মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যান। ট্রফি ছাড়াই সূর্যকুমার যাদবদের সেলিব্রেশন দেখা যায়।

আপনাদের অবশ্যই মনে থাকবে এশিয়া কাপে ভারত-পাক ম্যাচ শেষে দেখা গিয়েছিল, দুই দলের ক্রিকেটাররা একে অপরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেনি। এমনকী টসের সময়েও ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব পাক অধিনায়ক সলমান আলি আগারের সঙ্গেও হ্যান্ডশেক করেননি। ফলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ফাইনাল ম্যাচেও দেখা গেল বিতর্কিত ছবি। কি সেই বিতর্ক। টসের সময়ে দেখা গেল দুইজন আলাদা সঞ্চালককে। একজন ভারতের রবি শাস্ত্রী এবং অন্যজন পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনিস। টসের পর দেখা যায়, সূর্যকুমার যাদব টস জিতে যান রবি শাস্ত্রীর কাছে , তাঁর সিদ্ধান্ত এবং দল নিয়ে জানান। সলমন আঘা যান ওয়াকার ইউনিসের কাছে। তিনি ইউনিসের কাছে তাঁর টিম কম্বিনেশন ও সিদ্ধান্তের কথা বলেন। যেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। জানা যাচ্ছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের অনুরোধেই ফাইনালে দুই সঞ্চালককে রাখা হয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়, টসের পর ট্রফি নিয়ে ফটোশ্যুটের সময়ে ছিলেন না সূর্যকুমার যাদব। সলমন আলি আঘা একাই এশিয়া কাপ ট্রফির সঙ্গে ছবি তোলেন।

ফাইনালে ভারতের কাছে পাঁচ উইকেটে পর্যদুস্ত হয়েছে পাকিস্তান। আর এবার ফাইনালে ভারতীয় ক্রিকেট দলের ট্রফি না নেওয়া নিয়ে এ বার মুখ খুললেন পাক অধিনায়ক সলমন আঘা। তিনি বলেন মহসিন নাকভির থেকে ট্রফি না নিয়ে ভারত ক্রিকেটকে অসম্মান করেছে। তিনি আরও বলেন, ভারত আমাদের সঙ্গে হাত মেলায়নি। মহসিন নকভির থেকে ট্রফিও নেয়নি। ওরা আমাদের সঙ্গে যা করেছে, তাতে শুধু আমাদের অসম্মান করেনি, গোটা ক্রিকেটকে অসম্মান করেছে। এর শেষ কোথায় ? এর থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কী শিখবে? যা হয়েছে, খুব খারাপ।
পাক অধিনায়কের পাল্টা সূর্যকুমার যাদব বলেন, চ্যাম্পিয়ন দল ট্রফি পাচ্ছে না। খেলা শুরু করার পর থেকে জীবনে এমন ঘটনা আমি দেখিনি। আমার মতে দলের ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফেরাই আসল ট্রফি। ভারত এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন। এটাই আসল কথা।