সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : গরম পড়তেই দোকানে হঠাৎ করে বেড়ে যাচ্ছে কাঁচের দরজাওয়ালা নতুন নতুন ফ্রিজ। মুদির দোকান, পান দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, এমনকি গ্রামের চায়ের দোকানেও দেখা যাচ্ছে চকচকে কোল্ড ড্রিঙ্কের ভিজি-কুলার। কিন্তু প্রশ্ন হল- হঠাৎ কোম্পানিগুলোতে এত ফ্রি ফ্রিজ কেন? কেন একটা ছোট দোকানের জন্য কোটি কোটি টাকার লড়াই শুরু হয়েছে?

আসলে ভারতের সফট ড্রিঙ্ক বাজারে এখন শুরু হয়েছে এক বিশাল যুদ্ধ। একদিকে মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্সের পুনরুজ্জীবিত ব্র্যান্ড “ক্যাম্পা কোলা” অন্যদিকে বহু বছরের বাজার দখল করে থাকা আমেরিকার দুই জায়ান্ট- কোকা-কোলা এবং পেপসি। আর এই লড়াই এখন শুধু কোল্ড ড্রিঙ্কের স্বাদে আটকে নেই। এই যুদ্ধ এখন পৌঁছে গিয়েছে দোকানের ফ্রিজ, দাম, গ্রামবাংলার বাজার আর সাধারণ ক্রেতার পকেট পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক বছর ভারতের কোলা মার্কেটে যে লড়াই হবে, তা দেশের সবচেয়ে বড় FMCG যুদ্ধগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে। কারণ ভারতের পানীয় বাজার এখন দ্রুত বাড়ছে। আর সেই বাজার দখল করতে প্রত্যেক কোম্পানি মরিয়া। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিয়েছে ক্যাম্পা কোলা।
একসময় প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই ব্র্যান্ডকে ফের বাজারে ফিরিয়েছে রিলায়েন্স কনজিউমার প্রোডাক্টস। আর ফিরেই তারা বাজারে এনেছে কম দামের কৌশল। মাত্র ১০ টাকার বোতল দিয়ে ক্যাম্পা কোলা সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে কোক এবং পেপসিকে। যেখানে বহু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দাম বেশি, সেখানে কম দামে ঠান্ডা পানীয় দিয়ে ছোট শহর, গ্রাম এবং মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের টার্গেট করেছে ক্যাম্পা। আর তাতেই চাপে পড়েছে পুরনো জায়ান্টরা। এখন প্রশ্ন- ফ্রি ফ্রিজ বা ভিজি-কুলার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ভারতের বাস্তবতা পশ্চিমী দেশের মতো নয়। আমেরিকা বা ইউরোপে বড় বড় সুপারমার্কেট রয়েছে। কিন্তু ভারতে এখনও কোটি কোটি মানুষ ছোট দোকান থেকে কেনাকাটা করেন।
ছোট মুদির দোকান, পান দোকান, রাস্তার ধারের স্টল- এই দোকানগুলিই সফট ড্রিঙ্ক বিক্রির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। সমস্যা হল, এই দোকানগুলোর অনেকেরই নিজস্ব ফ্রিজ নেই। ফলে যে কোম্পানি দোকানদারকে ফ্রি ফ্রিজ দেবে, সেই কোম্পানির বোতলই দোকানে বেশি জায়গা পাবে। এবং ঠান্ডা পানীয় চোখের সামনে থাকলে ক্রেতার কেনার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়। এই কারণেই এখন কোক, পেপসি এবং ক্যাম্পা- সবাই কোটি কোটি টাকা খরচ করছে ভিজি-কুলার বসাতে। এই কাঁচের দরজাওয়ালা ফ্রিজ শুধু পানীয় ঠান্ডা রাখে না এটা আসলে বিজ্ঞাপনেরও কাজ করে। দোকানের সামনে রাখা ফ্রিজে ব্র্যান্ডের লোগো জ্বলজ্বল করে। ক্রেতার প্রথমেই সেই কোম্পানির নাম চোখে পড়ে।
বিশেষ করে গরমকালে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ এই ভয়ঙ্কর গরমে ঠান্ডা পানীয়র চাহিদা হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের মতো বাড়ে। আর সেই সময় যদি দোকানে ঠান্ডা বোতল না থাকে, তাহলে বিক্রি হাতছাড়া। তাই এখন কোম্পানিগুলোর মূল লড়াই- কে কত দ্রুত এবং কত বেশি দোকানে নিজেদের ফ্রিজ বসাতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নতুন কুলিং ইউনিট বসানো হচ্ছে দেশে।
পেপসির বোতল স্টোর সংস্থা Varun Beverages জানিয়েছে, তারা বছরে পাঁচ লক্ষেরও বেশি কুলিং ইউনিট বসাচ্ছে। অন্যদিকে রিলায়েন্সও দ্রুত নিজেদের ফ্রিজ নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শহর এবং গ্রামীণ বাজারে ক্যাম্পা কোলাকে পৌঁছে দিতে জোর দিচ্ছে তারা। আর এখানেই রিলায়েন্সের সবচেয়ে বড় শক্তি- তাদের বিশাল রিটেল নেটওয়ার্ক। Reliance Retail-এর নিজস্ব দোকান, ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল এবং সাপ্লাই চেন ব্যবহার করে ক্যাম্পা দ্রুত বাজারে ঢুকে পড়ছে।
শুধু তাই নয়- রিলায়েন্স কম দাম ধরে রেখে ক্রেতাকে টানার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ছোট শহর এবং গ্রামে এখনও দাম খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। অনেক ক্রেতা ব্র্যান্ডের থেকে দামের দিকে বেশি নজর দেন। সেখানে ১০ টাকার অফার খুব বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তবে কোকা-কোলা এবং পেপসিকে হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই দুই সংস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি- ব্র্যান্ড ভ্যালু। দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় বাজারে রয়েছে তারা। ক্রেতাদের মধ্যে একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এছাড়া তাদের সাপ্লাই চেন অত্যন্ত শক্তিশালী।
দেশের প্রায় প্রতিটি শহর, গ্রাম, হাইওয়ে, সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ- সব জায়গায় তাদের আউটলেট রয়েছে। তাই বাজারে নতুন খেলোয়াড় এলেও, এই দুই সংস্থা সহজে জায়গা ছাড়বে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় লাভ কার হচ্ছে জানেন?
ফ্রিজ তৈরির কোম্পানিগুলোর। Blue Star, Voltas, Haier-এর মতো সংস্থাগুলোর ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। কারণ সফট ড্রিঙ্ক কোম্পানিগুলো যত বেশি ফ্রিজ বসাবে,
তত বেশি অর্ডার পাচ্ছে এই সংস্থাগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে কমার্শিয়াল রেফ্রিজারেশন মার্কেট আগামী কয়েক বছরে বড় বুম দেখতে পারে। আর এর মূল কারণ- সফট ড্রিঙ্ক যুদ্ধ। তবে এই প্রতিযোগিতার একটা বড় প্রভাব পড়তে পারে বাজারের উপরও।
যদি দাম কমানোর প্রতিযোগিতা বাড়ে, তাহলে ক্রেতারা কম দামে বেশি বিকল্প পাবেন। ছোট দোকানদাররাও লাভবান হতে পারেন ফ্রি ফ্রিজ এবং বেশি অফারের কারণে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন উঠছে- এই মূল্যযুদ্ধ কতদিন চলবে? কারণ কম দামে বাজার দখল করতে গেলে কোম্পানিগুলোকেও বড় খরচ বহন করতে হবে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোল্ড ড্রিঙ্কের চাহিদা এখনও অত্যন্ত বেশি। গরম বাড়ছে, বাড়ছে শহর , বাড়ছে ফাস্ট ফুড সংস্কৃতি- ফলে সফট ড্রিঙ্ক মার্কেটও দ্রুত বড় হচ্ছে। আর সেই কারণেই ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানীয় বাজারগুলোর একটি হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের এই লড়াই নির্ভর করবে তিনটি জিনিসের উপর- ডিস্ট্রিবিউশন, কুলিং নেটওয়ার্ক এবং দাম। অর্থাৎ শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে আর বাজার জেতা যাবে না। যে কোম্পানি সবচেয়ে দ্রুত ঠান্ডা বোতল দোকানে পৌঁছে দিতে পারবে, সেই কোম্পানিই এগিয়ে থাকবে। আর তাই এখন ভারতের গরম শুধু তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে না বাড়িয়ে দিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার কোলা যুদ্ধও।