মাম্পি রায়, সাংবাদিক : নাসিকের টিসিএস (Tata Consultancy Services) অফিসে ‘ধর্মান্তর ও হেনস্থা’-র অভিযোগের তদন্তে সামনে এল একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশ সূত্রে খবর, গোটা ঘটনাটি ছিল সুপরিকল্পিত টার্গেটিংয়ের অংশ, যেখানে নতুন কর্মীদের মধ্যেই বিশেষ করে যারা আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত, বেছে বেছে নিশানা করা হত তাঁদের। ফেব্রুয়ারিতে দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ থেকেই শুরু হয় তদন্ত। যত দিন এগোচ্ছে, পুলিশের হাতে যত তথ্য উঠে আসছে ততই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আইটি জগতের এই খবর ঘিরে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের বেশির ভাগ সদস্যই ট্রেনিং টিমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে নতুন যোগ দেওয়া কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য, পারিবারিক অবস্থা এবং আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকত। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বেছে নেওয়া হত ‘সহজ টার্গেট’। তদন্তকারীদের দাবি, প্রথমে মানসিকভাবে দুর্বল করে, পরে ধীরে ধীরে তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করা হত।
অভিযোগ, ট্রেনিং চলাকালীন ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দুদের দেবদেবীদের নিয়ে কটূক্তি করা হত। এতে কেউ মানসিকভাবে আঘাত পেলে, তখনই ‘সহানুভূতির’ হাত বাড়িয়ে সামনে আসতেন এইচআর ম্যানেজার নিদা খান। অভিযোগ, তিনি ধীরে ধীরে ওই কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করতেন। এরপর জীবনযাপন, পোশাক এমনকি চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলত।
তদন্তে এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে এক তরুণী এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে পরিবারের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে বাড়ি থেকে দেবদেবীর ছবি সরিয়ে ফেলেন। এই অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
এ পর্যন্ত এই ঘটনায় সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছে আসিফ আনসারি, শাফি শেখ, শাহরুখ কুরেশি, রেজা মেমন এবং তৌসিফ আত্তার। তদন্তকারীদের অনুমান, এর পিছনে একটি সংগঠিত চক্র কাজ করছিল।
এই চক্র ফাঁস করতে অভিনব কৌশল গ্রহণ করে পুলিশ। মহিলা পুলিশ কর্মীরা পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ছদ্মবেশে অফিসে ঢুকে নজরদারি চালাতে শুরু করেন। কয়েক দিন ধরে গোপনে তথ্য সংগ্রহের পর, সামনে আসে একাধিক গুরুতর অভিযোগ—যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, ভয় দেখানো এবং জোর করে ধর্মান্তরণের চেষ্টা।
প্রথম এফআইআর দায়ের হয় যখন পুলিশ অভিযোগকারিণীর সঙ্গে সহকর্মী দানিশ শেখের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আনে। তারপর প্রথমেই গ্রেফতার করা হয় দানিশ শেখকে। এই ঘটনায় ধর্ষণ ও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। অভিযোগ, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান তিনি এবং নিজের বিবাহিত পরিচয় গোপন রেখেই চলত এধরণের কাজ। এরপর একে একে সামনে আসে আরও অভিযোগ। ১৮ থেকে ২৫ বছরের একাধিক তরুণী জানিয়েছেন, আপত্তি জানালে কাজের চাপ ব্য়াপকভাবে বাড়ানো হত। ব্যক্তিগত মন্তব্য করা হত এবং ভয় দেখিয়ে ভিন্ন ধর্মীয় আচরণ মানতে বাধ্য করা হত।
দানিশ শেখ ও তৌসিফ আত্তারকে গ্রেফতারের পর আত্তারের মোবাইল ফোন খতিয়ে দেখে আরও তথ্য তদন্তকারীদের হাতে আসে। যা তদন্তের পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু—এই সময়ের মধ্যে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। মোট ন’টি এফআইআর দায়ের হয়েছে দেওলালি ক্যাম্প ও মুম্বই নাকা থানায়। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, স্টকিং, অশালীন স্পর্শ, কুরুচিকর মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় বিষয়ে চাপ সৃষ্টি। অভিযোগকারীদের অধিকাংশই ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণী। সাতটি এফআইআরে মিল রয়েছে। যেখানে প্রস্তাবে রাজি না হলেই কাজের চাপ বাড়ানো হত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তদন্তে বিদেশ যোগের ইঙ্গিতও উঠে এসেছে। কিছু হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে মালয়েশিয়া-নিবাসী ‘ইর্মান’ নামে এক প্রচারকের উল্লেখ মিলেছে। যিনি ভিডিও কলে ওই টার্গেট করা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে অভিযোগ।
ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। অভিযুক্তদের ব্যাঙ্ক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই দুষ্কর্মে বিদেশি অর্থ সাহায্য রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। গুরুতর এই অভিযোগে কর্পোরেট কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষিতে Tata Consultancy Services জানিয়েছে, তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলছে এবং অভিযুক্ত কর্মীদের সাসপেন্ড করা হয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান N. Chandrasekaran এই অভিযোগকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
nashik, tcs, sexual harrasment, Investigation, Maharashtra, IT company